পঁয়তাল্লিশের দুপুর
সাগরিকা রায়
সুভদ্রা সমাদ্দার দরজা বন্ধ করে ঘর গুছোতে ভালবাসে। বরাবরই। এইটুকুই জানতো ওর পরিবারের লোকেরা। পরিবার বলতে দুই ভাই, এক বোন আর মা। বাবা অনেক আগেই ওপরে উঠে গিয়ে অনেকটাই স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন সুভদ্রাকে। সুভদ্রা সমাদ্দার বাপের ভাতের হোটেল “রাঁধো বাড়ো খাও” নিজের হাতে কষে বেঁধে নিয়েছে। দিনরাত সে হোটেল নিয়ে মত্ত আছে। তবে দুপুরটা ও নিজের মতো করে কাটাতে ভালবাসে। তখন ও ঘর গুছোয়। বেশ পরিপাটি করে ঘর গুছোয় সুভদ্রা। তখন ওকে ডেকে মরে গেলেও পাবে না।
ঘর গুছোয় তো? সকলেই জানে। সুভদ্রা নিজেই কতবার এ কথা বলেছে জনসমক্ষে। সে টিপটপ থাকে। পরিপাটি থাকে। তাকে দেখলেই অবশ্য এ কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়। লম্বা চুলের বিনুনি, পরিষ্কার করে রাখা নখ, মাজাঘষা করা ত্বক, শাড়ির সঙ্গে গেলাস হাতা ম্যাচিং ব্লাউজ, দুই ফিতের পাতলা চপ্পল-এর মধ্যেই তাকে বেশ সুন্দরী বলে প্রতিপন্ন হয়।
সুভদ্রা বিয়ে করেনি। আসল কথা হলো, বিয়ে হয়নি। কেউ এগিয়ে এসে একটা সংসার উপহার দেয়নি সুভদ্রাকে। একজন প্রিয় মানুষের সঙ্গে ঘর করতে পাঠায়নি সুভদ্রাকে। ভালবাসার লোক ছিল না। তাই বলে সুভদ্রা দুঃখ করে না। কাঁদে না। সে এই কাঁদুনে মেয়ে নয় কোন কালেই। সে নিজের মতো করে থাকতে চায়। পারেও। কাউকে রেয়াত না করেই আছে বেশ।
তবে নিরুদ্দেশ খালির মোহনা পিসি মাঝে সাঝে এসে ভ্রু কুঁচকে খুঁটিনাটি প্রশ্ন করে সুভদ্রার গোপন খবর নিতে চায় বৈকি। সুভদ্রা মনে মনে হাসে। এই পিসিটির বহুকাল আগে বিয়ে হয়েছিল এক বয়স্ক দোজবরের সঙ্গে। সে বিয়ে টেকেনি। লোকটি নাকি নিষ্কর্মা!
এই শব্দটাই অদ্ভুত লেগেছে সুভদ্রার। কী করে লোকটা নিষ্কর্মা হয়? তার একখানা বেশ বড় গ্রসারি শপ আছে। জমিজমাও কম নেই। সবটাই লোকটি নিজের হাতের তলায় রেখেছে। নিজে দেখাশোনাই করে থাকে। তাহলে আবার নিষ্কর্মা কাকে বলে?
মোহনা মুচকি মুচকি হেসে চোখ নাচায়, “সে সব কাজ পারে না। অনেক কিছু আছে, যা না পারলে তাকে নিষ্কর্মা বলে।”
“আচ্ছা? তাই বলে একটা লোককে ছেড়ে দিয়ে চলে এলে তুমি? অত সম্পত্তির দিকে চেয়ে দেখবে না একবার?” সুভদ্রা অবিশ্বাসের চোখে পিসিকে দেখে। এই নারী এত বোকা কেন?
“তুই বুঝিস না? তোর অভাব নেই কিছুর?” পিসি আশ্চর্য চোখে সুভদ্রাকে দেখে, “কিছু বল! আমি তোকে দেখি, আর অবাক হয়ে যাই!”
সুভদ্রা হাসে। মন দিয়ে রান্না করে। হোটেলের সারা মাসের কাস্টমারদের গুছিয়ে খেতে দেয়। জল এগিয়ে দেয়। জোর করে একটা বেগুনি পাতে দেয়, “খান। গরম আছে বেশ।”
এসবের মধ্যে আরামটা কোথায় পায় সুভদ্রা? নাকি আরাম কাকে বলে, সে তা বোঝেই না?
সুভদ্রা কাজের শেষে রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ফেরে। স্নান করে। পাটভাঙ্গা কাপড় পরে খাবার বেড়ে নিয়ে বসে। উল্টোদিকে বসে পিসি সুভদ্রাকে দেখে আর দেখে। গরম ডালে লংকা ডলে নিতে নিতে সুভদ্রা বলে, “গোপাল নাইয়ার খবর কী পিসি?”
মোহনা চমকে ওঠে। হাত থেকে বেগুনির টুকরো পড়ে যায়। অবাক গলায় বলে ফেলে, “গোপালকে চিনিস তুই?”
“না চিনে কী করি বলো? সেই ছোট্ট থেকে মা, কাকিমাদের মুখে গোপাল নাইয়ার গল্প শুনে আসছি। তুমি নাকি গোপাল নাইয়ার জন্যই বিয়ের বন্ধন থেকে বেরিয়ে এসেছ?”
মোহনা অনেকটা সময় নেয়। কিছুক্ষণ চুপচাপ খায়। গরম ভাতে মুর্গির ঝোল ঢালে বাটি থেকে। আনমনে এলোমেলো আঙ্গুল চলে ভাতের মধ্যে।
সুভদ্রা আর প্রশ্ন করে না। দুই একবার চোখ তুলে মোহনাকে দেখে। বছর পঞ্চান্নর মোহনা নীরবে খেতে থাকে। একটা সময় দুজনের খাওয়া শেষ হয়। হাতমুখ ধুয়ে, টেবিল পরিষ্কার করে কৌটো থেকে কুচনো সুপুড়ি মুখে দিয়ে মোহনা বলে, “গোপালকে কারা খুন করেছে, আমি জানি সুভদ্রা। কাউকে কিছু বলতে পারি না। হয়তো, আমার জন্যই গোপালকে মরতে হলো।”
সুভদ্রা চমকে মোহনার দিকে তাকিয়ে থাকে, “বলছ কী? খুন করেছে গোপাল নাইয়াকে? কারা করেছে, তুমি জানো?”
“জানি!”
“কারা?”
“নাম বলতে পারব না, রে। এখনও আমার সেই সাহস হয়নি। এ জীবনে সেই সাহস হবে না। আমি একটা কেঁচো। বুঝলি?’
সুভদ্রা মোহনার হাতদুটো ধরে থাকে। এই পিসির সঙ্গে ওর বয়সের পার্থক্য খুব বেশি নয়। ওর এখন পয়ঁতাল্লিশ। পিসি পঞ্চান্ন। দশ বছরের পার্থক্য একটা সময়ে সমবয়স্ক হয়ে ওঠে। কিন্তু গোপাল নাইয়াকে কেউ খুন করেছে জেনেও পিসি খুনির নাম বলে না। কারণ সে ভয় পায়। এটা একটা কথা হলো? যে নিজের স্বামীর ঘর ছেড়ে গোপালের জন্য চলে এসেছে, সে কাকে ভয় পাবে?
আচ্ছা, খুনিটা কে? গোপালকে খুন করার স্বার্থ কার?
মোহনা বলে, “খুনিকে ধরিয়ে দিলেই কি গোপালকে ফিরে পাবো? পাবো না। সে এ জীবনের মতো আমার জীবন থেকে চলে গেছে। তবে, আমি খুনিকে ছেড়ে দেব না সুভদ্রা। মাঝে মাঝে সাহস আসে। ফের চলে যায় সব সাহস। আসলে, আমার যে অন্যের ঘরের ভাতে বেঁচে থাকা। সাহস এসেও অনেক হিসেব কষে ফের চলে যায়। সব সাহস সোয়েটারের কেটে যাওয়া অংশ থেকে খুলতে থাকা উলের মতো হুড়হুড় করে গড়িয়ে যেতে থাকে। “মোহনা আঙ্গুল দিয়ে টেবিলের ওপরে দাগ কাটে।
সুভদ্রা শোবার ঘরে গিয়ে বিছানা ঝেড়ে নিতে নিতে হেসে বলে, “সাহসের আর কী দরকার? নিজের পছন্দের জীবন বেছে নিতে ভয় পাওনি যখন, একমুঠো ভাতের জন্য অন্যায়কে ক্ষমা করো না!”
মোহনা চুপচাপ গিয়ে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়ল।একটা চাদর গায়ের ওপর দিয়ে অন্ধকারে চোখ মেলে রইল। কত ছবি আসে, যায় চোখের সামনে দিয়ে। জীবনের যা কিছু রস, সৌন্দর্য সব দিয়েছিল গোপাল নাইয়া। অথচ দেখ, সুভদ্রা সেসব সুখের কণামাত্র না পেয়েও কেমন উজ্জ্বল সুখে মেতে আছে!
রাত বাড়ে। ঘুমিয়ে পড়ে মোহনা। সুভদ্রা গভীর ঘুমে সাঁতার কাটে। কেউ একজন একটা লোককে খুন করেছে। তার প্রেমিকা সাহসের অভাবে খুনিকে সনাক্ত করে না। পাছে, সে যদি ভাত না দেয়!
কে ভাত দেয় মোহনাকে? ওর ছোট ভাই বিশ্বনাথ? সে কি গোপালকে খুন করেছে? বিশ্বনাথই তো সুভদ্রার কাকা! কাকা কিনা পিসির প্রেমিককে খুন করেছে। হায় হায়। কবে হলো এসব!
চট করে ঘুম থেকে উঠে আসতে থাকে সুভদ্রা। কাকা গোপালকে খুন করেছে কেন? গোপালের সঙ্গে কাকার কী শত্রুতা? কখনও গোপালের সম্পর্কে দুটো বাজে কথাও বলেনি কাকা। তাহলে সেই শান্ত মাথার লোকটা কেন খুন করে ফেলল বোনের প্রেমিককে?
ঘুম এল ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ। স্বপ্নে এল গোপাল নাইয়া। স্বপ্নিল চোখদুটো নিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলছে, “কেউ আর আমার জমিতে কাজ করে না। আমার জমিটা শুকিয়ে গেল রে!”
সুভদ্রা ঘুম থেকে উঠে একটু গুম থেকে স্নানে চলে গেল। এসে পুজো করে দুটো সেদ্ধ ভাত করে নিল। পিসি আজ থাকবে এখানে। দুপুরে দোকান থেকে মাছ-ভাত পাঠিয়ে দেবে সুভদ্রা। এখন ওকে বের হতে হবে। হোটেলের মাছ কিনবে। আজকের রান্নার মেনু গত রাতেই গুছিয়ে ফেলেছে। এঁচোড় হবে কুচো চিংড়ি দিয়ে। ডাল, বেগুন ভাজা, চাটনি। তিন রকম মাছের ঝোল। রুই, ভোলা, তেলাপিয়া। একটাই তেলে সব মাছ কড়া ভেজে ঝোলে দিয়ে দেওয়া।
কোনরকমে দুটো সেদ্ধভাত মুখে দিয়ে পায়ে চটি গলিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল ও। হোটেলে কানুকাকা আছে। সে ম্যানেজার – কাম ঠাকুর সব। কানুকাকার হাতে সব বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ির পথ ধরল সুভদ্রা। কাকার কাছে জানতে হবে, কী হয়েছিল গোপাল নাইয়ার সঙ্গে।
বাড়ি ছেড়েছে অনেক দিন হয়ে গেল। নিজে হোটেল খুলবে, এই খবর কানে যাওয়ার পরেই কাকা বলেছিল, এই বাড়িতে থেকে সেসব হবে না। সুভদ্রাও বাড়ি ছেড়েছিল। কেউ ফিরিয়ে নিতে আসেনি। বাড়িতে যেতে ইচ্ছেও করে না। কী আছে ওখানে? কোন টান নেই সুভদ্রার। ভালবাসা যেখানে নেই, সেখানে কেনই বা টান অনুভব করবে ও?
ওকে দেখে বাড়ির সকলেই বেশ অবাক হলো। মা ছিল না। শিব মন্দিরে গেছে জল ঢালতে। বউদিরা দুইজন আপ্যায়নে কমতি করল না। ভাইপো, ভাইঝিরাও খুশি হলো ও যাওয়াতে। কিন্তু, কাকাকে দেখা গেল না। কাকা কোথায়?
“এই তো, খেজুর গাছের নীচে বসে চট পেতে রামায়ণ পড়ছেন”
“কাকা রামায়ণ পড়ছে?” মোহনা রীতিমতো অবাক প্রায়। কাকা কখনই ধর্ম নিয়ে ভাবেনি। সব সময় ধর্মের পথে চলার কথা বলেনি কখনওই। কেবল, প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েছে, সে কিনা এখন রামায়ণ পড়ছে! অবাক কান্ড বটে।
মানুষের নিজের মধ্যে থাকা অভাববোধটা নিজেই যদি পূরণ করতে এগিয়ে আসে মানুষ, তাহলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকে না। কাকা সুভদ্রাকে দেখে মোটেই খুশি হল না বলে মনে হলো সুভদ্রার। কিন্তু, সুভদ্রা কখনও কে কী ভাবল, এটা ভেবে দেখেনি। সুতরাং এবারেও কাকার কালো মুখ দেখেও না দেখার ভান করে বলল, “একটা কথা জানার ছিল। গোপাল নাইয়ার মৃত্যুটা কীভাবে হয়েছিল?”
বিশ্বনাথ চমকে উঠেছে, “কে গোপাল? আমি চিনি না।”
“তা বললে হবে না। গোপালের খুনিকে একজন চেনে। সে আমাকে তোমার নাম বলেছে। কেন খুন করতে হলো গোপালকে?”
“আমি খুন করব কেন? তবে, খুন করতে পারলে খুশি হতুম। সে আমার বংশের মেয়েকে শ্বশুরের ঘর থেকে বের করে আনে কোন সাহসে? সে কি আমার মেয়েকে বেশ্যা বানিয়ে আমাকে জব্দ করতে চেয়েছিল?”
“মানে কী? তোমাকে জব্দ করবে কেন সে? তুমি তার কী ক্ষতি করেছ যে, সে তোমার ক্ষতি করার জন্য তোমার বোনের সঙ্গে মিথ্যে সম্পর্ক তৈরি করে, তাকে শ্বশুরের ঘর থেকে বের করে আনবে? এত কী দায় তার?”
“দায় আছে। সেই জন্য সে প্রতিশোধ নিয়েছে। মোহনা গোপালের জালে ফেঁসে গেছে। আমি বুঝিয়েছি অনেকবার। মোহনা বুঝতে চায়নি। কাজেই আমার হাতে না হোক, আর কারও হাতেই মরতে হয়েছে গোপালকে। কিন্তু, তুই এর মধ্যে যাসনে। এর জন্য তোকেও মরতে হলে আমার ভালো লাগবে না।” বিশ্বনাথ ফের রামায়ণে মন দেয়।
সুভদ্রা কেঁপে উঠেছে কাকার কথা শুনে। এই লোকটা অনেক ক্ষমতা বাগিয়ে ফেলেছে তো! কার থেকে বাগালো? কে দিল এত সাহস কাকাকে? ভাইঝিকে খুনের হুমকি দেয় কোন কাকা?
শিব মন্দির থেকে ফিরে সুভদ্রাকে দেখে খানিকটা যেন ভয় পেয়ে গেল সুভদ্রার মা তুলিকা। তামার ঘটিখানা বারান্দার এক কোনে রেখে এসে বলল, “হঠাৎ?”
“কেন? আসব না?”
“চলে গেলি মুরোদ দেখিয়ে। তাই দেখে অবাক হচ্ছি।”
“অবাক হয়ো। আগে আমাকে বলো, গোপাল নাইয়ার সঙ্গে বাবার শত্রুতার কারণ কী? কেন গোপাল বাবাকে জব্দ করতে চেয়েছিল?”
তুলিকার মুখ সাদা হয়ে গেল, “এসব তোকে কে বলল? মোহনা?”
“না। বাবা বলেছে। একটু আগেই। আমার প্রশ্নের জবাব দাও। কী হয়েছে গোপালের সঙ্গে কাকার?”
“আমি জানি না।”
“জানো। বল।”
তুলিকা অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখে চারপাশে, “আমি তোকে কিছু বললে সকলে জেনে যাবে যে আমিই বলেছি।তাই এখানে নয়। বাগানে গিয়ে দাঁড়া।”
খানিক পরে যখন সুভদ্রা নিজের ভাতের হোটেলের দিকে যাচ্ছে,মাথা টলমল করছে। তুলিকা জানিয়েছে, কাকার সঙ্গে নাকি সম্পর্ক ছিল গোপালের বোন সনকার। সনকা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। বিশ্বনাথ সম্পর্ক অস্বীকার করে। তখন সনকা সুইসাইডের চেষ্টা করে। একুশ দিন লড়াই করে মারা যায় সনকা। সেদিনই গোপাল নাইয়া বিশ্বনাথের সামনে এসে প্রতিজ্ঞা করেছিল। “তোরও বোন আছে। দেখে যা শুধু!”
তাহলে, মোহনা পিসির প্রেমের শুরুটাই একটা জালকাটি দিয়ে বোনা প্রেম? যার ভিতরের অসংখ্য ফুটো দিয়ে সব জল বেরিয়ে যায় বাইরে? রয়ে যায় শুকনো কিছু কাঠি?
তাহলে, কেন সুভদ্রার স্বপ্নের ভিতরে ঢুকে পড়ে গোপাল নাইয়া? কেন সে অনুর্বর জমির কথা বলে? নাকি চাষহীন জমি? সেই জমি কি মোহনা? গোপাল কি প্রতিশোধ নিতে গিয়ে অজান্তে ভালবেসেছিল মোহনাকে?
মোহনা পিসি জ্বলছে। দীর্ঘদিন ভালবাসার অভাবে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে পঞ্চান্নর এক নারী। সুভদ্রা গত রাতেও ভেবেছে, পঞ্চান্নতেও কি শরীরের জ্বালা থাকে নারীর মধ্যে? ভেবেছে, পিসি এখনও মোহনা নামের একটা কবিতা থেকে কেন বেরিয়ে আসতে পারছে না? কেন সে পয়ঁতাল্লিশের ভাইঝির পিসি হয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনে জুড়ে যেতে পারছে না? কেন প্রেমিকের অভাব বোধ তাকে কামড়ে খাচ্ছে?
বাগানে মায়ের মুখ থেকে সবটা শোনার পরে সুভদ্রা জানতে চেয়েছিল, কেন গোপালকে মরতে হলো?
মা কেঁদে ফেলেছে, “মোহনার বর তোর কাকার সঙ্গে ষড় করে লোকটাকে মেরে ফেলল। নইলে মোহনা যে গোপালকে বিয়ে করতো! ওর স্বামীর পক্ষে সে যে বড় লজ্জার ব্যাপার। একটা পুরুষ সে কথা সহ্য করবে কী করে? এতে যে স্বামীর অক্ষমতা প্রকাশ পেয়ে যাবে। আর মোহনা সে কথা অল্পস্বল্প বলতে শুরুও করেছিল। স্বামীকে পৌরুষের খোঁচা দিলে স্বামী সহ্য করবে? পুরুষ তো সে!”
সুভদ্রার চোখ কেন যে ভিজে আসে অদেখা একটা লোকের জন্য, ও বুঝতে পারে না। সেই লোকটা শুধু প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। প্রতিশোধ নিতে চেয়ে ভালবাসার অভিনয় করতে গিয়েছিল। কিন্তু, অভিনয় তো সবাই করতে পারে না। কখন যে মোহনাকে সত্যিকারের ভালবেসেছিল সে! অনেক না পাওয়া, অনেক চাওয়া, কিছুই মেটেনি গোপাল নাইয়া আর মোহনার। তাই মুচকি হেসেও সত্যিটা জানতে চেয়েছিল মোহনা, “তোর কোনও অভাব বোধ নেই সুভদ্রা? বিয়ে না করে ভালো আছিস? সত্যিকারের কোনও বন্ধু পাশে না থাকলে কি ভালো থাকা যায়?”
একটা সংসারের জন্য লালায়িত কি সুভদ্রাও নয়? কাউকে না জানিয়েও কেমন সুন্দর করে সংসার করে ও। দুপুরের ঘোর লাগা সময়ে ও একা থাকে। ইচ্ছে করে একা হয়ে যায়। শোবার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে ঘর গুছোয়। বরের সঙ্গে খুনসুটি করে। আবছা আবছা আলো আধারিওলা ঘরে এক স্বপ্নের পুরুষের সঙ্গে মিলন হয় ওর। রোজ দুপুরে। রতিক্লান্ত সুভদ্রা মুখ মুছে উঠে বসে যখন, ওর খসে পড়া শাড়ি, ব্লাউজ, ওর ঘেমে ওঠা শরীর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে ওঠে। লজ্জারুণ হাসি ঠোঁটে লেগে থাকে বিগত সুখের স্মৃতি স্মরণ করে। এই স্মৃতিতে পুরুষ আছে। আসে পুরুষ। কিন্তু তার চেহারা আসে না পূর্ণভাবে।
এ এক জাদুসংসারের খেলা। সকলে পারে না। সুভদ্রা নিজের জাদুময়তায় আবিষ্ট হয়ে আছে। সেখানে দুঃখ নেই। বিচ্ছেদ নেই। আছে কেবল অপূর্ব এক প্রেমাবিষ্ট শরীরের আস্বাদ।
মোহনা অপেক্ষা করে ছিল সুভদ্রার জন্য। ঘেমে ওঠা মুখের সুভদ্রাকে দেখে এক গেলাস নুন চিনির জল এগিয়ে দেয়। একটু লেবুর রস টিপে দিয়েছে। জলে চমৎকার স্বাদ এসেছে।
পিসিকে দেখছিল সুভদ্রা। গেলাস ফেরত দিয়ে বলল, “কিছু বলবে?”
“কোথায় গিয়েছিলি তুই? এমন হন্তদন্ত হয়ে?”
“বাড়িতে। কাকার কাছে। মায়ের কাছে। নাইয়াকে মেরেছে দুজন মিলে। কাকার কাছে পরামর্শ নিতে এসেছিল তোর বর। কাকা পরামর্শ দিয়েছে। দুজনে মিলে মেরেছে। কাকা কেন মেরেছে? স্বার্থ কী? কাকা নাইয়ার বোনকে গর্ভবতী করে পরে দায় নিতে অস্বীকার করে। নাইয়ার বোন সুইসাইড করে। নাইয়া প্রতিশোধ নিতে তোমাকে ব্যবহার করবে ভেবে প্রেমিক হয়ে এসে সংসার থেকে তোমাকে বের করে আনে।”
বিস্ফারিত চোখে সুভদ্রার কথা শুনছে মোহনা। সুভদ্রা বলে, “সে তোমাকে মিথ্যে ভালবাসতে গিয়ে সত্যি ভালবেসে ফেলল। তাই ওকে মরতে হলো। বুঝেছ?”
মোহনা বলে, “মিথ্যে? তাহলে মরল কেন?”
“ওটাই তো কথা গো। সে ভালবেসে শুকনো জমির কষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। তুমি পিপাসা নিয়ে বসে আছো, নাইয়া জানে, সে আর ফিরবে না। ভালবাসা শুকিয়ে গেছে তোমাদের। এখন কী বলবে নাইয়াকে?”
মোহনা উঠে দাঁড়ায়। দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ পুড়িয়ে দিচ্ছে শরীর। মোহনা একবার জ্বলতে থাকা রাস্তার দিকে চেয়ে দেখে। পরে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, “সুভদ্রা। আমি যাই। আর আসব কিনা…! জানি না! নাইয়ার জন্য মন কাঁদছে রে!”
সুভদ্রা মোহনাকে টেনে ধরল, “নাইয়াকে চাও?”
“মানে?”
“এসো। আমার সঙ্গে এসো। পাশের ঘরে যে বিছানা পেতে রেখেছিলাম তোমার জন্য, সেটাতে এ ক’দিন ঘুমোওনি। আমার সঙ্গেই ছিলে। আজ থেকে ওই পাশের ঘর, বিছানা, সব তোমার। সংসার তৈরি কর মনের মতো করে। আলমারি চাই, একটা টিভি, আলনা…! নিজের সংসারে ঢোকো মোহনা।আর পিসি হয়ে থেকো না।”
“কিন্তু নাইয়ার কথা কী বলছিলি?” মোহনা অসহায় চোখে চারপাশ দেখে।
“তুমি ওখানেই নাইয়াকে পাবে। সে আসবে, যদি মন দিয়ে ডাকো। এসে তোমাকে আদর করবে। সব তোমার ভাবনায়। তুমি যদি পারো, তবে সব আসবে ওই ঘরে। চেষ্টা করো। কিন্তু কাউকে ওই ঘরের কথা বলবে না। এসব তোমার নিজের কথা। কাউকে বলার নয়।”
“আমি ওই ঘরে…?”
“হ্যাঁ। কথা বলো নাইয়ার সঙ্গে। অনেকদিন কথা হয়নি। অনেক কথা জমিয়ে রেখেছ। যাও। নাইয়া অপেক্ষা করে আছে সেই কবে থেকে।”
মোহনা হাসল। সুভদ্রার তুলে ধরা আঙ্গুলের দিকে নজর রেখে পাশের ঘরটা দেখল। একটু লজ্জিত হেসে বলল, “আমি যাই ওই ঘরে?”
“যাও।” সুভদ্রা ইশারায় যেতে বলে। পয়ঁতাল্লিশ বোঝে পঞ্চান্নর মধ্যেও সেই খিদে আছে, যা কাউকে বলার নয়।সংসারের খিদে, ভালবাসার খিদে। কে দেবে হাতে তুলে? তাই একটা ঘর দরকার। নিজের ঘর। যার দরজা আছে। ভিতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া যায়!
