প্রেমজ কোরক
হর্ষ দত্ত
অবনতমুখী যূথিকার দিকে কটমট করে তাকিয়ে মহিলা উকিল বাসবী গুহ চেঁচিয়ে উঠলেন, পাথরের মতো বসে আছিস কেন? সদা যখন তোকে ঘাঁটত, তখনও কি এমন শক্ত হয়ে শুয়ে থাকতিস? কথার জবাব দে যূথী। না দিলে ঠাটিয়ে চড় মারব।
মেয়েটা এমনিতেই কিশোরবেলার রঙিন প্রেমের খেসারত দিচ্ছে। শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত। তার মধ্যে এই ধরনের মানসিক আঘাত প্লিডার ম্যাডাম কেন করছেন? মোহিত উত্তর খুঁজে পেল না। এ অঞ্চলের নামকরা টিউশন স্যার মোহিত। টিউশনি ওর জীবিকা। মোহিতই ওর এক বন্ধুর মাধ্যমে, মাইতি-পরিবারের সঙ্গে তমলুক কোর্টের ক্রিমিনাল সাইডের উকিল, বাসবীর যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে।
যূথীর বাবা ফটিক মাইতি দুঃসংবাদটা সবার আগে, মোহিতকে চোখের জল মুছতে মুছতে জানিয়েছিল। ফটিক বলেছিল, মাস্টার, পরিবারের মান-সম্মান নষ্ট হয়েছে হোক। কিন্তু মেয়েটা যেন নিগ্রহের মুখে না-পড়ে। মোহিত জানে, আদতে কেসটা জুভেনাইল কোর্টের আওতায় যাবে। কিন্তু আগে থেকে একটা কড়া পিটিশন তৈরি করে রাখা খুব জরুরি। এসব মাইনর কেসে নাবালক-নাবালিকা অপরাধীদের পুলিশি-হেফাজত থেকে কোর্ট জেলে পাঠায় না। এদের ঠিকানা হয় কোনও হোম। যূথী ও সদানন্দের ভাগ্যে এই শাস্তিই আপাতত লেখা আছে।
ওর মেয়েকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে দিনের পর দিন, জোর করে ধর্ষণ করেছে সদানন্দ। এর ফলে মেয়ের পেটে ভ্রূণ জন্ম নিয়েছে। ভ্রূণের বয়স এখন কম-বেশি দু’মাস কয়েক দিন— এই তথ্যটা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে ফটিক মাইতি। তাই উকিল ম্যাডাম একটু পর পরই যূথীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। ব্যাপারটা মোহিতের একদম ভাল লাগছে না। কৈশোর ও যৌবনের উন্মাদনা শুধু ছেলেদের মধ্যে থাকে, মেয়েরা এর বাইরে—এমন চিন্তা শুধু ভুল নয়, সম্পূর্ণ অবাস্তব। তফাৎ শুধু এইটুকু, মেয়েরা নিজের পাগলামিকে সংযত করতে পারে, ছেলেরা পারে না।
বাসবী কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, সদার হাতে নিজেকে তুলে দিয়েছিলি, নাকি ওই দুশ্চরিত্রটা তোকে বিছানায় পেড়ে ফেলেছিল!
যূথী মাথা নিচু করে আগের মতোই বসে আছে। যেন গ্রাম্য মহিলাদের ঝগড়ার ভাষাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে, বাসবী গুহর জিজ্ঞাসার ভাষা। বিরক্তি চেপে রেখে মোহিত গম্ভীর স্বরে বলল, ম্যাডাম, আমি কি একবার ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি…আপনি আপনার কাজ করছেন, তবু…
হ্যাঁ, হ্যাঁ…নিশ্চয়ই বলতে পারেন। বাসবী মৃদু হাসলেন, ওর বাবার কাছে শুনেছি, আপনি তো যূথিকাকে কয়েক মাস টিউশন পড়িয়েছিলেন। ওই বদ ছেলেটার হাতছানিতে মেয়েটা নিজের জীবনটাকেই নষ্ট করল।
মোহিত নীরবে মাথা নাড়ল। ক্লাস নাইনের মেয়েদের ব্যাচে যূথী পড়তে আসত। গায়ের রং সামান্য ময়লা হলেও, মুখশ্রী সুন্দর। তবে খুবই সাধারণ মেধার মেয়ে। সব সাবজেক্টে পিছিয়ে থাকা একটি ছাত্রী। মাধ্যমিকটা যাতে পাশ করতে পারে, ফটিকবাবুর এমন নাছোড় অনুরোধে ওকে টিউশন ক্লাসে নিয়েছিল। যূথী হঠাৎই টিউশনে অনুপস্থিত হতে শুরু করার পর, ওর বাড়ি থেকে কেউ কিছু জানায়নি। এমনতর ভদ্রতা বোধের অভাব এসব আধা-গ্রামীণ অঞ্চলে নতুন নয়। অন্য ছাত্রীদের জিজ্ঞেস করায়, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মুখ টিপে হেসে বলেছিল, সদুদার সঙ্গে উড়ে বেড়াচ্ছে। মোহিত যা বোঝার বুঝে নিয়েছিল।
সদানন্দ সামন্ত নামের ছেলেটিকে মোহিত চেনে। বখাটে টাইপের, উড়নচণ্ডী, ফূর্তিবাজ। তমলুকে ওদের নাকি দুটো নার্সিংহোমের রমরমা ব্যবসা। উচ্চমানের জীবনযাপনের জন্যে টাকা-পয়সার অভাব নেই। মোহিত এও শুনেছে, সামন্ত-পরিবার নাকি কালো টাকার পাহাড়ের ওপর বসে আছে। বলতে গেলে উকিল ম্যাডামের চেম্বারে মোহিত এসেছে ফটিকবাবুর নিরন্তর অনুরোধে। যূথীর মা বীথি শুকনো মুখে বসে আছে। ঘর জুড়ে স্তব্ধতা নেমে আসার পর মোহিত সস্নেহে জিজ্ঞেস করল, যূথিকা, তুমি কি সদানন্দকে ভালবাস?
হ্যাঁ। যূথীর ‘হ্যাঁ’ বলার মধ্যে গভীর প্রত্যয় ঝরে পড়ল।
মোহিত স্মিত হাসল, বেশ। এটাও সত্যি, কাউকে ভালবাসা অপরাধ নয়। কিন্তু তোমাদের পরস্পরের ভালবাসা তো অপরাধকে ডেকে এনেছে। জানো নিশ্চয়ই।
জানি। আইনের চোখে আমরা অপরাধী। আমার এখনও আঠারো বছর হয়নি। পনেরোতেই পেটে বাচ্চা এসে গেছে। বাচ্চার বাবার বয়স সতেরো। তাই আমরা দু’জনেই জুভেনাইল— নাবালিকা আর নাবালক। একটানা কথা বলে যূথিকা মুখ তুলে মোহিতের দিকে তাকাল।
ওর উত্তর শুনে এই মুহূর্তে সারা ঘর স্তম্ভিত। বাসবী গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন, খুব গুছিয়ে কথা বলতে শিখে গেছিস দেখছি! ওঃ, একেবারে সুইট সিক্সটিন! এত কথা কে শেখাল? এ মেয়ে লজ্জাটুকুও দেখছি বিসর্জন দিয়েছে।
ওর দিকে ছুটে আসছে ব্যঙ্গের তির। তবু উকিল ম্যাডামের চোখের দিকে তাকিয়ে যূথী উত্তর দিল, যা করে ফেলেছি তা মা-বাবাকে বলার পর ওরা চেপে রাখতে পারল না। চিৎকার-চেঁচামিচি, কান্নাকাটি, সব মিলিয়ে চারদিকে হুলুস্থুল।…পাড়া-প্রতিবেশী, থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি—সব জায়গা থেকেই তো এই একই কথা শুনছি। শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গেছে।
বাসবী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, মোহিত তার আগেই জিজ্ঞেস করল, মিলনের প্রথম দিনই সদানন্দকে তুমি বাধা দিতে পারতে। কেননা এগারো-বারো বছরেই, মা-মাসি বা বাড়ির বয়স্ক মহিলারা কিশোরীদের সন্তানসম্ভবা হওয়ার কারণগুলো বলে সাবধান করে দেন। বন্ধু-বান্ধবরাও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে।…তুমি তো জানতে, এর পরিণতি কী হতে পারে?
উত্তর দিচ্ছে না যূথিকা। সবাই যেন সাগ্রহে অপেক্ষা করছে। বাবার দিকে হাত বাড়াল যূথী, জলের বোতলটা একটু দাও।
ফটিক আধ-খাওয়া জলের বোতলটা নাইলনের থলি থেকে বের করে মেয়ের হাতে তুলে দিল। এ অঞ্চলের মানুষ দেখছে, মেয়ের কীর্তিতে দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে ফটিকের মুখ। তার ওপর সদানন্দর বাবা পুরন্দর সামন্ত প্রতিদিন হুঙ্কার দিচ্ছেন, ফটিকের নচ্ছার মেয়েটা সদাকে ফাঁসিয়েছে। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। পুলিশ ওদের কোর্টে তুলুক তারপর কী করে সত্যি-মিথ্য়ে বের করতে হয় আমার জানা আছে। পুরন্দরের স্ত্রী সুনীলা ফটিকদের বাড়িতে এসে, যূথীর মায়ের সঙ্গে অশ্রাব্য ভাষায় তুমুল ঝগড়া করে গেছে। ত্রিপাঠী-বাড়ির হুমকিতে ফটিক ভয় পাচ্ছে না। মেয়েটার ভবিষ্যৎ ভেবে মুষড়ে পড়ছে।
স্যর, শুধু ওর দোষ নয়, আমিও দোষী। সদুদা প্রথম প্রথম কিছুটা পাগলামি করেছিল। তবে আমিও আদরে আদরে ডুবতে চেয়েছি। দিদিমণি, আপনি ওকে একতরফা অপরাধী বানিয়ে দেবেন না। সদুদা আমাকে জোর করে ভোগ করেনি। যে আমাকে ভালবাসে তাকে বাধা দেওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম।
এসব কথা কিছুই শুনব না। তুই সদানন্দকে বাঁচাতে চাইছিস। বাসবী গর্জে উঠলেন, শয়তানটা তোকে রেপ করেছে। ছেলেটাকে ননবেলেবল্ অ্যাক্টে হোম থেকে হোমে সাত বছর তো বটেই, দশ বছর পর্যন্ত ঘুরিয়ে মারব।… জুভেনাইল অ্যাক্ট বড্ড জটিল। তা না হলে অ্যাডাল্ট ক্রিমিনাল কেসে ফাঁসিয়ে সদানন্দকে জেল খাটাতাম। বীথি আর ফটিকের দিকে ঘুরে ভদ্রমহিলা বললেন, আপনাদের মেয়েকেও হোমে থাকতে হবে। আপাতত পাঁচ-ছ মাস। তারপর অ্যাপিল করলে বাড়িতে আসার অনুমতি দেবে কোর্ট।
বীথি কাঁদো কাঁদো স্বরে জানতে চাইল, দুধের বাচ্চাটি আর যূথী আমার কাছে থাকবে তো!
হ্যাঁ। নোংরা হোমগুলোতে তো আর নিও-ন্যাটাল কেয়ার ইউনিট নেই। বাসবী গা গোলানো ভঙ্গিতে বলল, ওরা দায়িত্ব নেবে কেন? তবে বিচারক যা রায় দেবেন, সেটাই হবে।
হাত-ঘড়ি দেখে মোহিত উঠে পড়ল। সামান্য হেসে বলল, যূথিকার বক্তব্যে এটা পরিষ্কার, ওদের দু‘জনের দোষ ফিফটি-ফিফটি। আপনার পিটিশনে এই সত্যটা রিফ্লেক্টেড হোক।
শ্রীমতী গুহ হতবাক্, তাহলে মামলার আর থাকল কি মশাই!
মোহিত প্রসন্ন মুখে উত্তর দিল, থাকল দুই অপ্রাপ্তবয়স্কের প্রেম ও তার পরিণতি।
জুভেনাইল কোর্টে পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করার পর, প্রথম দিনের শুনানির শেষে বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও এদের অপরাধ অ্যাডাল্ট অফেন্সের সমতুল্য, তা সত্ত্বেও ভারত সরকার প্রণীত ‘দি জুভেনাইল জাস্টিস (কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন) অ্যাক্ট, ২০১৫ অনুয়ায়ী অপরাধীদের থানার লক আপে বা গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা যাবে না। এদের মানসিকভাবে সংশোধনের জন্যে জরুরি ভিত্তিতে, সরকার পরিচালিত হোমে রাখার ব্যবস্থা করার নির্দেশ আদালত দিচ্ছে।
আইনকে পুলিশ বুড়ো আঙুল দেখায়নি। সমস্ত নিয়মকানুন সাঙ্গ করে সদা ও যূথীকে হোমে পাঠিয়ে দিয়েছে। সদানন্দ আন্দুলে অবস্থিত একটা হোমে আছে। যূথীর হোম পাঁশকুড়া শহরের সীমানা পেরিয়ে চাকলিপুর নামে একটা গ্রামে। দুটি পরিবারের পক্ষেই হোমগুলো বেশ দূরে অবস্থিত। সামন্তদের তড়পানি অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। এর মধ্যে ওদের উকিল কমলেন্দু ত্রিপাঠী জজের কাছে সদানন্দের দুর্বল হার্ট, কনভাল্শন হওয়ার প্রবণতা নিয়ে একটা অ্যাপিল করেছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ডাক্তারের সার্টিফিকেট না-থাকায় বিচারক আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন।
অপর দিকে বাসবী ম্যাডাম হিউম্যানিক গ্রাউন্ডে একটা কোর্ট অর্ডার বের করে এনেছেন। যূথীর গর্ভস্থ শিশুর পরিপুষ্টির জন্যে হোমের খাবার-দাবার একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। দূরে হলেও মেয়ের মা অথবা বাবা বা পিসতুতো দাদা দু’বেলা রান্না করা খাবার দিয়ে আসতে প্রস্তুত। বিচারক সহানুভূতির সঙ্গে আর্জি মেনে নিয়ে আদেশ জারি করেছেন। মিসেস গুহ অবশ্য়ই খুশি। কিন্তু হোমগুলোর দুরবস্থার তালিকা দীর্ঘ।
ফটিকবাবু ওঁর চেম্বারে এসে ছলছল চোখে বলেছে, ম্যাডাম, মেয়ে আমার হোমে নেই, যেন নরকে আছে। আমরা গেলেই কান্নাকাটি করে। সুপারভাইজার দিদি, রাঁধুনি মাসি, বাথরুম পরিষ্কার করার ঝি আর নড়বড়ে দারোয়ান—এই চারজন ছাড়া আর কেউ নেই। মেয়ের সঙ্গে দেখা করার আগে, মেন গেটের কাছে অফিস ঘরে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়। সুপারভাইজার দিদি অন্য সব কাজ সেরে পারমিশন দেওয়ার জন্যে নামেন। ওঁর ব্যবহার ভীষণ কাঠ কাঠ। একদমই হাসিখুশি নন।
তাতে আপনার কী? আপনাদের মেয়ের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা করতে দিচ্ছে, যূথী বাড়ির খাবার খাচ্ছে—আর কী চাই! অল্প বয়সে না-বুঝে অপরাধ করে ফেলেছে। কিন্তু এমন সিম্পল অফেন্ডারদের এরা দাগি ক্রিমিনাল মনে করে। কিছু করার নেই। হোমগুলোর ইনফ্রাস্টাকচার যে কত বাজে, তা আমার জানা আছে।
ফটিক মাইতি গভীর দুঃখে বলেছিল, জানেন, মেয়েগুলো সারাদিন যেন ঘরে বন্দিদশায় থাকে। আমার মেয়ের সঙ্গে যে-মেয়েটি থাকে, সেও পোয়াতি। নিজেদের দুর্ভাগ্য নিয়ে ওরা আর কত আলোচনা করবে! পড়াশোনা কিংবা হাতের কাজ শেখার কোনও ব্যবস্থা নেই। স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে কোনও ডাক্তার কিংবা কাউন্সেলিং করতে কোনও বিশেষজ্ঞ আসেন না। অথচ ‘এসেছে‘ বলে মেয়েদের দিয়ে সই করিয়ে নেওয়া হয়। মেয়েই এইসব দুর্নীতির কথা বলে। ব্যাপারটা বুঝুন! এ ছাড়া আরও অনেক কিছু হয়। যূথী ওর মাকে বলেছে। আমি আপনাকে সেসব বলতে পারব না। হোমে ঢুকিয়ে দিয়ে সরকার হাত ঝেড়ে ফেলে। কী অন্যায় বলুন তো! এর থেকে তো জেলে থাকা ভাল।
বিষণ্ণ হেসে অভিজ্ঞ উকিল বাসবী আবার বলেছিল, আমি জানি।… ঠিক আছে, আজ আপনি আসুন। বাইরে অন্য ক্লায়েন্ট অপেক্ষা করছেন।
চেয়ার থেকে ফটিক উঠতেই যেন মনে পড়ে গেছে, বাসবী এমনভাবে বললেন, ও হ্যাঁ, আপনি আমাকে মাসখানেক পরে একবার ফোন করবেন। আপনাদের মামলাটা এজলাসে উঠতে দেরি আছে। ডেট পেলেই আপনাদের জানাব। সামন্ত-পরিবার সম্পর্কে কানাঘুষোয় একটা কথা কানে এল, সেটাই পরে বলব।
ফটিক চিন্তিত মুখে বাড়ি ফিরে এসেছে। পুরন্দরদের সম্পর্কে উকিল দিদিমণি কিছু একটা বলবেন, স্বামীর মুখে একথা শুনে বীথি ঠোঁট উলটেছে, নতুন কী আর জানাবেন! সামন্তরা আমাদের চরম ক্ষতি করেছে। ভগবান ওদের বিচার করবেন।
ক্যালেন্ডারে ফটিক দাগ দিয়ে রেখেছে। এক মাস হতে এখনও বারোদিন বাকি। ভোর ভোর ও আর বীথি উঠে পড়ে। সংসারের নানা কাজের সঙ্গে জুড়ে গেছে মেয়েকে দুপুর ও রাতে খাবার দিয়ে আসবার কাজ। সকাল এগারোটার মধ্যে বেরোলে, চাকলিপুর পৌঁছতে দুপুর একটা-দেড়টা বেজে যায়।
আজ সাতটা নাগাদ অকস্মাৎ স্ত্রী সুনীলাকে নিয়ে, পুরন্দর সামন্ত গ্রিলের সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে মোলায়েম স্বরে বলল, ফটিক, একটু ভেতরে আসছি। তোমাদের সঙ্গে জরুরি কয়েকটা কথা আছে। আমরা যা বলব, যা চাইব, তাতে সম্মতি জানাবে, তা দেবে। সেই আশা নিয়ে এসেছি। অবশ্য না-বলার অধিকার তোমাদের আছে।
ওদের দেখে বীথি জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। কেউ ভোল বদল করলে তার পাপ বদল হয় না। সামন্তরা ভাল করেই জানে, ওদের ছেলে কতদূর শয়তান। রুক্ষ গলায় বীথি বলল, আগে বিষয়টা বলো, তারপর তো দেওয়া-না দেওয়ার প্রশ্ন।
সৌজন্য বজায় রেখে ওদের বারান্দার চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করল ফটিক। দু‘জনে সানন্দে বসল। বীথিকে বলল, ওরা সকালে এসেছে। কমলাকে চা-জলখাবারের ব্যবস্থা করতে বলো।
কমলা এ বাড়ির ঠিকে কাজের মেয়ে। একটু পরেই চা-বিস্কুট নিয়ে এল। কোনও আয়োজনেই পুরন্দর আপত্তি করল না। বৃষ্টিপাত, চাষ-আবাদ, জিনিসের দামবৃদ্ধি, নির্বাচন ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে টুকটাক আলোচনার পর পুরন্দর ও সুনীলা বরফের মতো গলে গিয়ে বলল, আমরা যূথীকে পুত্রবধূকে রূপে পেতে চাই। তোমরা এই সিদ্ধান্ত ভেঙে দিও না। যা হবার হয়ে গেছে। আগুপিছু না-দেখে একটা অ্যাক্সিডেন্ট করে ফেলার জন্যে ওরা দোষী। কিন্তু যে-শিশুটি জন্ম নেবে সে তো কোনও দোষ করেনি।
মাইতি-দম্পতির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সকালবেলায় চরম শত্রুর বাড়ি এসে, এই নাটক করার মানে কি? ওরা স্তম্ভিত হয়ে বসে আছে দেখে, সুনীলা হঠাৎ উঠে এসে বীথির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় টেনে নিয়ে বলল, আমি কোনও আপত্তি শুনব না। যূথী আমারও মেয়ে। সদুর সঙ্গে ওকে ঘর বাঁধতে দাও। যূথী আর ওর বাচ্চার দায়িত্ব আমার। আগামী মাসে যূথীর গর্ভাবস্থার সাত মাস। নিয়ম মতে শাশুড়ি-মা হিসেবে আমি ওর সাধ দেব।
কঠিন গলায় ফটিক বলল, তোমরা অনুরোধ করলেই তো হবে না। আগে আমাকে উকিল ও অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। তারপর ডিসিশন জানাব।
যাওয়ার আগে পুরন্দর হাত জোড় করে বলল, ওরা ভুল করেছে বলে আমরা যেন ভুল না করি।
স্থির হয়ে বসতে পারছে না ফটিক। ব্লাড প্রেসার বাড়ছে। বীথি বলল, তুমি বাসবী দিদিমণিকে ফোন কর, এখুনি…
উদ্বিগ্ন ফটিকের কাছ থেকে নীরবে সব শুনে ম্যাডাম হো হো শব্দে হেসে উঠলেন, ঠিক করেছিলাম, আমিই এগুলো আপনাদের জানাব। তা, সামন্তদের তর সইল না। প্রস্তাবটা প্রথম দিয়েছিলেন ওঁদের উকিল ত্রিপাঠীবাবু। তারপর সামন্তরা এসেছিলেন। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার জন্যে ওঁরা বুকের রক্ত দিতেও প্রস্তুত। ওঁদের প্রস্তাব মেনে নিতে পারেন। আপনারা রেপ কেসের মামলা তুলে নিলে সদা-যূথীর হোমে থাকার বছর কমে যাবে।
আপনিই বলেছিলেন, সামন্তরা পাজির পা ঝাড়া। বদমাইস, ধূর্ত। ওদের এই কান্নাকাটির পেছনে অন্য মতলব থাকতে পারে। ওরা যূথীকে এখনই পুত্রবধূ বলছে। কিন্তু দু‘জনের বিয়ের বয়সই হয়নি। ম্যারেজ রেজিস্ট্রি তো দূর অস্ত।
হ্যাঁ, আঠারো বছরের আগে ওদের বিয়ে হবে না। তবে আমি কথা দিচ্ছি, ম্যারেজ রেজিস্ট্রি ঠিক সময়ে করিয়ে দেব।…ওদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। আমি আপনাদের পাশে আছি। বেগড়বাই করলে মিথ্যে মামলায় সামন্তদের জেলে ঢুকিয়ে ছাড়ব।
মোহিত স্যরের বাড়িতে গিয়ে এই অবিশ্বাস্য ডেভালেপমেন্ট জানাল ভূতগ্রস্ত ফটিক। মোহিত খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, ঝুঁকি একটু থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু ফাঁদ থেকে বেরোবার আর তো কোনও পথ নেই। বাসবী ম্যাডাম যখন কথা দিয়েছেন, তখন সিওর পাশে থাকবেন। কষ্ট হলেও ওঁর পরামর্শ মেনে নিন।
সন্তান প্রসবের মাস ধরে পরবর্তী ছ’মাস, শিশু-সন্তানের স্বাস্থ্য ও মাতৃদুগ্ধ পানের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে, যূথীকে হোমে থাকার বাধ্য-বাধকতা থেকে কোর্ট সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছে। কিন্তু সদানন্দ পেরোলে একদিনের মুক্তি ছাড়া আর কোনও সুযোগ পায়নি। তবু সামন্ত-বাড়িতে উৎসবের আমেজ। ভাবি বউয়ের প্রথম দফা সাধভক্ষণ অনুষ্ঠান। এলাহি ব্যবস্থা যূথীর বাড়ির লোকেরা এখনও আসেনি। যূথিকার সঙ্গে মৃদু ঠাট্টার আভাসে হেসে কথা বলছে সামন্তদের আত্মীয়-স্বজন। তবে কোথাও যেন একটা ‘কিন্তু’ ঝুলে আছে।
দুপুর দেড়টা নাগাদ একটু ফাঁকা পরিসর পেয়ে যূথী তৃপ্ত স্বরে সদানন্দকে বলল, একটু ছাদে যেতে ইচ্ছে করছে। কতদিন পরে তোমাকে কাছে পেয়েছি। বিকেল হলেই তো তুমি হোমে চলে যাবে!
সদাদা ইতস্তত করছে দেখে যূথী গলা নামিয়ে যেন পরামর্শ দিল, কাউকে জানানোর দরকার নেই। চুপি চুপি চলো।
ছাদে সারি দিয়ে ফুল গাছের টব। একটা লাল-সাদা রঙের ঝুমকো জবার কুঁড়ির দিকে, আঙুল তুলে দেখিয়ে যূথী বলল, তোমার দেওয়া কোরক, আমার পেটে একটু একটু করে পাপড়ি মেলছে। মনে আছে, তোমাদের নার্সিংহোমে তুমি খুব গোপনে আমার গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট করতে চেয়েছিলে। ভাগ্যিস আমি কিছুতেই রাজি হইনি। আজ তোমার আনন্দ হচ্ছে না! নতুন অতিথি আসছে আমাদের ঘরে।
সন্তানের বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল যূথিকা। থরথর করে কাঁপছে সদা। আবেগ, ভালবাসা, সান্নিধ্য আর চেপে রাখতে পারল না কিশোর সদানন্দ। চোখের জলে ভিজতে ভিজতে যূথীকে বুকে টেনে নিল আগ্রাসী নদীর মতো।
