short-story-rishi-angira

ঋষি অঙ্গিরা
জয়তী রায়

 ঘটনাটা অদ্ভুত। এমন ঘটনা শূরসেন রাজ্যে আজ পর্যন্ত ঘটেনি! রাজ্যে অনাহার নেই। অবিচার নেই। অন্যায় নেই। রাজা চিত্রকেতুর নামে দেশ সুদ্ধ লোক জয় জয় করে। প্রজা খুশি। পাত্র মিত্র অমাত্য … খুশি সবাই। গাছে গাছে ফল ফুল, জমি ভরা ধান, পুজো হয়, উৎসব হয়, এক কথায় সোনার দেশ। 

  সোনার দেশে এমন ভয়াবহ ঘটনা! শোকে পাথর গোটা রাজ্য। প্রধান রানি শয্যা নিয়েছে। রাজা জলটুকু মুখে দিচ্ছেন না। চারিদিকে হাহাকার। অন্নকূট উৎসব হওয়ার কথা ছিল, মন্দিরের পূজারীর হাতে প্রদীপ জ্বলছে না তো পুজো কি হবে? যেন এক ভয়ঙ্কর অমঙ্গল পাখা মেলে দিয়েছে আকাশে! ধূসর আঁধারে ছেয়ে থাকে সোনার দেশ। 

রাজা চিত্রকেতুর কাছের মানুষ সেনাপতি রণজয়। সে একদিন সাহস করে শোকার্ত রাজার কাছে গিয়ে বসে বলল — রাজন। আপনার শোকের উপশম ঘটানো ঈশ্বরের অসাধ্য। কিন্তু, এই ঘটনা স্বাভাবিক নয়। কেউ তন্ত্র মন্ত্র করে অশুভ শক্তি ছড়িয়ে দিয়ে ভয়ানক কাণ্ডটি ঘটিয়েছে। যেই করে থাকুক, সে থামবে না। এর পরের শিকার হয়ত আপনি। কাজেই সমাধান করা প্রয়োজন। 

ক্লান্ত বিষন্ন স্বরে রাজা বললেন — অশুভ শক্তি কেন আক্রমণ করবে? মহাদেবের পুজো হয় নিয়মিত। রণজয়, রণজয়, তুমি কিছু টের পেয়েছ? 

রণজয় বিশাল চেহারাটি সামনে ঝুঁকিয়ে বিনীত স্বরে বলল — নদীর জলে ভেসে উঠেছিল বিকটাকায় মৃত জলজন্তু। ফলগুলি অকালে পড়ল শুকিয়ে। পুরোহিতের হাতে ছিটকে পড়ল উত্তপ্ত তৈলকণা। 

রণজয় আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় অন্তঃপুর থেকে ভেসে এল আর্তচিৎকার। দাসীরা ছুটে বাইরে এসে ঘোষণা করল —- রানিমা আবার জ্ঞান হারিয়েছেন। 

চিত্রকেতু তাকালেন রণজয়ের দিকে। দৃষ্টিতে আকুতি। কোমরের তরবারি ঝলসে উঠে দাঁড়াল রণজয় — চিন্তা করবেন না। রাজ্যের শোক, অভিশাপ, দুর্ভোগ দূরে যাবে। আমি আনতে যাচ্ছি তাঁকে। 

উপাধান থেকে মাথাটি সামান্য তুলে রাজা বললেন — কাকে? 

আবেগ কম্পিত স্বরে বলে উঠল রণজয় —- সপ্তঋষির একজন। অথর্ববেদ সংকলক, মন্ত্র দ্রষ্টা ও যজ্ঞ প্রবর্তক, অগ্নির মত উজ্জ্বল, দেবগুরু বৃহস্পতির পিতা, অগ্নিহোত্র যজ্ঞের বিশেষজ্ঞ, তিনি সেই ঋষি যিনি মানুষকে দেবতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথ দেখিয়েছেন। আমি সেই ঋষি অঙ্গিরাকে আহ্বান করব। তিনি অবশ্যই আসবেন। কে আপনার একমাত্র পুত্রকে বিষ খাইয়ে হত্যা করল জানতে পারব ওঁর কাছ থেকে। রাজামশাই, ঋষি অঙ্গীরা থাকলে অশুভ শোক দূরীভূত হবে। অপেক্ষা করুন রাজন। তাঁর আশ্রম একটু দূরে। যত শীঘ্র পারি … আপনি … নিজেকে স্থির রাখুন রাজন। 

 

২

আনন্দলোক

 

  সরস্বতী নদীর তীরে ঋষি অঙ্গিরার আশ্রম। বড় বড় বৃক্ষের ছায়া ঘন হয়ে ঘিরে আছে আশ্রমের বিশাল আঙিনা। লোকালয়ের থেকে অনেক দূরে এই আশ্রম সম্পর্কে নানা ভয়ের কথা প্রচলিত আছে। নদীর জলে আগুনের ঢেউ দেখা যায়, কমণ্ডুল হাতে চারমাথা দুলিয়ে আসেন ব্রহ্মাদেব। মানসপুত্রের আশ্রম। ব্রহ্মাদেব অলৌকিক উপায়ে তাঁর ইচ্ছে আর ধ্যান একসঙ্গে করে সৃষ্টি করেছিলেন জনা কতক দিব্যভাব সম্পন্ন অতিমানব। অঙ্গিরা তেমন একজন অযোনিসম্ভবা। ব্রহ্মাদেব আকাশপথে মাঝে মাঝে আসেন। তেজবান এই পুত্রটি তাঁর ভারি প্রিয়। সম্প্রতি তাঁকে নিয়েই সপ্তর্ষি মন্ডল গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি অপরা বিদ্যায় অতি কুশলী হওয়ার কারণে অঙ্গিরা নামটি বিবেচিত হয়েছে। মনুষ্য লোকে ঋষিপঞ্চমী অনুষ্ঠিত হয় ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে। সাতটি আসন, সাতটি পাত্র, জল, ফুল নৈবেদ্য দিয়ে নিবিষ্ট মনে প্রার্থনা করলে সংসারের মঙ্গল হয়। অদৃশ্য ভাবে ঋষিরা এসে আশীর্বাদ করে যান। আগুনের মত দীপ্তিময় পুত্রটি একটু বেয়াড়া গোছের তেজিয়ান। ডাকলেই হাজিরা দেয় না। তাই নিয়ে ঋষিমহলে একটু অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। ঋষি ক্রতু বলেছিলেন —- মরিচী, অত্রি, পুলস্ত্য, পুলহ, বশিষ্ঠ আর আমার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন অগস্ত্য বা বিশ্বামিত্র। অঙ্গিরা মোটেই উপযুক্ত নয় সপ্তর্ষি হিসেবে। ব্রহ্মার মন জাত পুত্র হলেই হয় না যোগ্যতার পরিচয় দিতে হবে।
ব্রহ্মা প্রতিবাদ করে বলেছিলেন — ভুল কথা। ঋগবেদের প্রথম, দ্বিতীয়, পঞ্চম, অষ্টম, নবম ও দশম মণ্ডলের সুক্ত রচনা করেছেন। সবচেয়ে বড় কাজ অগ্নি উপাসনা। আজ অগ্নি ঘিরে কাজ হচ্ছে কত শত কাজ।

ক্রতু কথা বাড়ায়নি। ব্রহ্মাদেব  নিজের প্রিয় পুত্রকে মাঝে মাঝেই সতর্ক করেন। আজ যেমন বলতে এসেছেন যে, অগ্নিহোত্র নিয়ে যে প্রচার করা হচ্ছে মানব কল্যাণে সত্যিই কাজ করবে তো? এমন সরল সহজ উপায়ে যদি ঈর্ষা দ্বেষ হিংসা ত্যাগ করে মানব নতুন সৃষ্টি করতে পারে তবে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের জন্যে তার চেয়ে মঙ্গলকর আর কিছু হয় না।

আলোচনা করতে এসে ব্রহ্মাদেব মোহিত হয়ে চেয়ে আছেন। সরস্বতী নদীর জলে টুকরো টুকরো আগুন কণা খেলা করছে। হিম হিম সন্ধ্যায় পরী উড়ছে। মেঘের মত সাগরের ফেনাভ ঢেউয়ের মত তিরতির তিরতির পাখায় ভর করে রত্তি রত্তি পবিত্র রূপসী উড়ে উড়ে খুনসুটি করছে। ঘাসের ডগায় ডগায় হিরে কুচি জলের বুকে ধরা পড়েছে জোছনা, বিশাল বিরাট বৃক্ষগুলি কায়া বদল করে দাঁড়িয়ে আছে যেন প্রহরী। অশুভ শক্তির প্রভাব বিরক্ত না করে। এই কল্পভূমিতে কাজ করছে শৃঙ্খলা। বিশ্বজনীন শৃঙ্খলা।

ব্রহ্মা দাঁড়িয়ে আছেন। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে না। ঋষিদের জগতে বিদ্বান চিন্তাবিদ গবেষকের অভাব নেই। মানবজনম বৃথা অপচয় যেন না করা হয় সে নিয়ে ওঁরা নিরন্তর প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন … মহৎ কাজের মধ্যে নিমগ্ন সাধক ঋষিদের মধ্যে অঙ্গিরার কাজ কেন ব্যতিক্রমী উপলব্ধি করে পরম শান্তি পেলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা। মানব জীবন ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। বৃক্ষ, পর্বত, নদী, সাগর — আপন আপন ক্ষেত্রে স্বমহিমায় বিরাজমান। মানবের মত চিন্তাশক্তি নেই তাই মানুষের জগতের চাইতে তাদের শৃঙ্খলা বেশি, সমস্যা কম।

মানবের চিন্তন জগৎ শান্তিতে নেই। চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে নিরন্তর সংঘাত চলেছে। দেবতা – অসুর – মানব ব্যস্ত নিরন্তর সংগ্রামে। বাহ্যিক সম্পদের দখলদারি যেমন তেমন অন্তরেও প্রবল বিষাদ বোধ কাজ করে। এই সেদিন হয়ে গেল সমুদ্র মন্থনের মত ভীষণ কাণ্ড। কত চাতুরী প্রতারণা করে অমৃত হাসিল করল দেবতারা। ভূমি দখল, জল দখল – কে কত দখল করতে পারে এইরকম দখলদারি পরিস্থিতিতে নষ্ট হয় প্রকৃতির ভারসাম্য। সেই ভারসাম্য  বজায় রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টায় নিজেদের মগ্ন রেখেছেন ঋষি – মহর্ষি। সৃষ্টিকে লোভের আগুন থেকে বাঁচানোর প্রয়াসকে বলা হয় ঋত। ঋত অর্থ প্রকৃতির মধ্যে ঈশ্বর দেখা। যজ্ঞের ধূম রক্ষা করছে বাতাবরণ, ধর্মীয় আচার আচরণে রক্ষা পাচ্ছে সামাজিক ও পারিবারিক শৃঙ্খলা, নৈতিক শৃঙ্খলা সমস্ত কিছু বজায় রাখাকে ঋত বলা হয়। সত্য, ধ্রুব সত্য, পরম সত্য — এইগুলি একত্রে ঋত। কিন্তু, সত্য কথাটাই আজকাল অলীক। অনৈতিক কার্য কলাপের ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সত্যের প্রতি আস্থা। মিত্র ও বরুণ একত্রে অনেক চেষ্টা করলেও ইন্দ্র নিয়ে এসেছে জোর যার সৃষ্টি তাঁর নীতি। ঋষিদের উপর চাপ সৃষ্টি করছেন দেবতারা। নতুন ধর্ম, নতুন নীতি নতুন করে সত্যের সংজ্ঞা গড়ে উঠে পৃথিবীতে আসুক পরিবর্তন। নৈতিক আদর্শ বিসর্জন দিতে যদি হয় পৃথিবীর ভালোর জন্যে তবে তাই হোক।

একমাত্র অঙ্গিরা হয়ে আছে অটল অচল। তাঁর মতে, সত্য এক এবং একমাত্র। সত্য অভিমুখী জীবন সুস্থ ও সুন্দর — এই অমোঘ বাস্তব পরিবর্তন বা সংশোধন করা সম্ভব নয়। কিন্তু, প্রভাবিত করার পথটি বদলানো যায়। শুষ্ক জ্ঞান দিয়ে নয়, মলিনতাহীন কল্পলোক সৃষ্টি করতে  জানতে হবে। ভালবাসতে শিখবে। এমন এক মায়া জগৎ সৃষ্ট হবে যেখানে সবাই নিজেকে মনে করবে পরম সুখী। মায়া বটে কিন্তু মিথ্যা নয়। সুন্দরের সাধনা করতে করতে ভিতর বাহিরে তৈরি হবে সুন্দরের প্রতি মোহ। পাওয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে শুরু হবে অন্বেষণ। সুন্দরের খোঁজে পরিবর্তন হবে চরিত্রে। সুন্দর  মনে ফুল ফুটবে, পরী উড়বে, সরস্বতী নদীর জলে ছোট্ট ছোট্ট জ্ঞানের প্রদীপের ফুলকি দেখা যাবে! আনন্দলোক। মঙ্গলালোক সৃষ্টি হবে। অঙ্গিরা ঋষি এইটাই সাধনা করে আসছে।

আহা! কত বড় কাজ! সপ্তঋষির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যথেষ্ট যোগ্যতা আছে। এটাও তো আবিষ্কার। মনের দোলাচল কেন হচ্ছে, কেন বিঘ্নিত হচ্ছে শান্তি — এই কেনর উত্তর খুঁজে চলেছেন ঋষি। মনের গঠন নিয়ে চলছে পরীক্ষা নিরীক্ষা। মন হচ্ছে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। দেখা যায় না অথচ চালনা করে। মন সংযত রাখার শিক্ষা পেয়ে গেলে সমস্যা কমে যাবে আশি ভাগ। এখন কথা হচ্ছে, পিতা ব্রহ্মা কি প্রবেশ করবেন আশ্রমে? ওই ধ্যান মোহিত আনন্দলোকে? নাহ্। থাক। অদৃশ্য হয়ে যেমন এসেছিলেন তেমন অদৃশ্য হয়ে মিলিয়ে গেলেন তিনি।

   সন্ধ্যার অন্ধকারে এক অশ্বারোহী রাজপুরুষ এসে দাঁড়াল সরস্বতীর তীরে। তাঁর চোখে অবশ্য অলৌকিক দৃশ্য একটিও ধরা পড়ল না। সাধারণ ভাবেই মন্দির দ্বারে ঝুলন্ত ঘন্টা বাজিয়ে নিজের আগমন বার্তা ঘোষিত করল রাজপুরুষ। 

 

৩

ঈর্ষা

 

কুটিরে বিশ্রাম করছিল রাজা চিত্রকেতুর সেনাপতি রণজয়। নিজেই এসেছে। সে নিশ্চিত – ঘটনা ঘটিয়েছে রাজপরিবারে কোনো সদস্য। সেক্ষেত্রে ঘটনা আচমকা প্রকাশ কাম্য নয়। তাই অন্য কাউকে না পাঠিয়ে নিজে এসেছে। অঙ্গিরা দেখা করবেন আগামীকাল মধ্যাহ্নে। আজ রাত ভর চলবে বিশেষ তান্ত্রিক পূজা ও মন্ত্র জপ। শিষ্য এসে বিনীত স্বরে বলে গেল —- গুরুদেব ব্যস্ত। কিন্তু, আপনার কারণটি ব্যথিত করেছে। দেখা করবেন। নিশ্চিন্ত থাকুন। 

ভোর ভোর বেদমন্ত্র শুনে ঘুম ভাঙল রণজয়ের। চারিদিকে পবিত্র বাতাবরণ। রণজয় হানাহানি রক্তারক্তি নিয়ে মত্ত থাকে। নিশ্চিন্ত ভোর, পদ্মপাতায় প্রসাদ, নদীর মধুর বাতাস, পাখির গান — কর্কশ মনে যেন শান্তির প্রলেপ। রণজয় ভাবে, রাজসিংহাসনে নিত্য অশান্তি। শেষপর্যন্ত … ওই তো … রানি অজ্ঞান হচ্ছেন … রাজা শোকের আগুনে পুড়ছেন! সন্দেহ আঙুল তুলছে প্রিয়জনের দিকে! 

অঙ্গিরা অল্প কেঁপে উঠেই আবার স্থির হয়ে গেলেন। শিশুহত্যা? বিষপ্রয়োগে? স্থির শিখাটির মত দিব্য ভাবাপন্ন শরীরে আর কোনো ভাবান্তর ঘটল না। মৃদুস্বরে প্রশ্ন করলেন —- সর্ব কুশল? ঋষির স্বরে মধু ঝরে। একবার মাত্র দেখা হয়েছিল তখন তরুণ আজ প্রৌঢ় হওয়ার কথা হলেও এমন অপরূপ কান্তি, সতেজ, শ্যামল কৃষ্ণ মেঘের মত বর্ণে মুকুতার দ্যুতি … বয়স থেমে থাকে কি করে কে জানে? প্রখর দৃষ্টি ভিতর পর্যন্ত ফালা ফালা করে দিচ্ছে! রণজয় একজন সেনাধক্ষ্য মাত্র, সে কতটুকু আর বলবে? রাজা শূরসেন বিবাহ করেছেন পনেরবচ্ছর পার হয়ে গেল। আটজন রানি। এতদিন সন্তানের মুখ দেখেননি। রাজার প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে একদিন এলেন এক মহাত্মা। জড়ি বুটি মিশিয়ে ওষধি দিলেন আটজন রানিকে। সন্তান লাভ হল একমাত্র বড়রানির। রাজ্য ভেসে গেল আনন্দ আর খুশিতে। দান হতে লাগল অকাতরে। নাচিয়ে গাইয়ে বাজিয়ের দল ধূম সৃষ্টি করল রাজধানীতে। অন্তঃপুরে খাতির বেড়ে গেল বড়রানির। ধন্য ধন্য করে বলতে লাগল সবাই — ওষধি আটরানি খেয়েছিল। পূণ্যবতী লক্ষ্মী যিনি তিনি জন্ম দিলেন রাজপুত্রের। 

রণজয় লক্ষ্য করেছিল বাকি সাতরানির মুখ কালো। সারাদিন ফুসফুস গুজগুজ। মনে খটকা নিয়ে নাম করণের আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছিল। লোকে লোকারণ্য রাজধানী। প্রতিবেশী রাজ্যের রাজা এসেছেন। তুমুল ব্যস্ততা। রাজপুত্রের সোনার সুতোয় বোনা জামা, সোনার ছোট্ট মুকুট, হাতে গলায় হীরে মুক্তোর অলঙ্কার, কোলে কোলে ঘুরছে শিশু, হাসছে খিলখিল, উপহার নিয়ে আসছে অতিথি অভ্যাগত, পুরোহিত সাজিয়ে তুলছেন পুজোর উপকরণ। একটু পরেই শুরু হবে মূল অনুষ্ঠান। ডাক পাঠানো হল অন্তঃপুরে। ডাক পড়ছে ডাক পড়ছে ডাক পড়ছে … কোত্থাও নেই। খোঁজ খোঁজ খোঁজ খোঁজ। পাওয়া গেল। মর্মান্তিক দৃশ্য। ওইটুকু শিশু নীল হয়ে গেছে বিষের জ্বালায়। একটু আগেই হাসিতে জ্বলজ্বল চোখে পৃথিবী দেখছিল, এখন পড়ে আছে নীথর শরীর। 

—- অহ! শিশু স্বভাবতই অসহায়। দুষ্কর্মকারীর নিষ্ঠুরতা ক্ষমার অতীত। অনুমানে কেউ আছে কী? প্রশ্ন করলেন অঙ্গিরা। 

হাত জোড় করে রণজয় বলে — হে মহাত্মন, ছোটমুখে শোভা দেবে না তবু বলতেই হবে — রাজার সাতরানি জড়িত থাকার সম্ভাবনা আছে। অনুমান নয়। প্রধানা দাসীকে উৎকোচ দিয়ে স্বীকার করতে বাধ্য করেছি যে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল শিশুর দ্বীপ্রাহরিক আহারে। কিন্তু দাসীর কথায় রানি কেন শাস্তি পাবে? হাতে নাতে প্রমাণ না পেলে … রাজা মৃত্যুদণ্ড দেবেন বলেছেন। প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

অঙ্গিরা একটু চিন্তা করলেন। তাঁর অনেক কাজ। মহাজাগতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ তিনি নিচ্ছেন। গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথগুলোর গতি নিয়ন্ত্রণ যেমন প্রয়োজন তেমনি তমোশক্তি বা কৃষ্ণ শক্তি বা অন্ধকার শক্তি নিয়ে কাজ করা জরুরি। এই শক্তি কী সে সম্পর্কে কেউ জানে না। নিবিষ্ট চিত্তে ধ্যান করে অঙ্গিরা জানতে পেরেছেন, মহাবিশ্বের সত্তর ভাগ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার শক্তি জাগ্রত করতে পারলে বহু অজানা সমস্যার সমাধান হবে। অঙ্গিরা দেখেছেন, মানব মন ধারণ করে থাকে অন্ধকার শক্তি। ঈর্ষা, লোভ, লালসা আত্মগোপন করে থাকে সেখানে। মনের তিনটি ভাগ। সচেতন, অচেতন ও অবচেতন। অবচেতন মনের কাল কুঠুরিতে জমে থাকা পাশবিক সত্তা। ঘুমন্ত সেই সত্তা প্রকৃতিগত ভাবে ভীষণভাবে হিংস্র। ইন্ধন পেলে সে জাগে। নিষ্ঠুর হত্যা, অত্যাচার করে। শরীর চক্র সম্বন্ধে জানলে অবচেতন মন হাতের মুঠোয় রাখা যায়। দেহ এবং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড পাঁচটি তত্ত্ব দিয়ে তৈরি। ক্ষিতি ( মাটি) অপ ( জল) মরুৎ ( বায়ু) ব্যোম ( আকাশ) এবং অগ্নি। ঋষি অঙ্গিরা কাজ করছেন অগ্নি নিয়ে। অগ্নির মাধ্যমে প্রার্থনা পৌঁছে দেওয়া হয় মহাশক্তির কাছে।  

গভীর ভাবনার মাঝখানে শুনতে পেলেন রণজয় ডাকছে —- প্রভু? 

দিব্য চক্ষু ধীরে উন্মীলন করে তিনি বললেন —- বৎস। এই স্থানে এসে একটু বসো। অল্প সময়ের জন্যে তোমায় নিয়ে যাব আগামী যুগে। 

—- সে কি গুরুবর? 

—- ভয় নেই। ভবিষ্যত দর্শন করলে বোঝা যাবে ঋষি মহর্ষি কেন এমন প্রাণান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন! 

—- ভবিষ্যৎ দর্শন? আমার মত তুচ্ছ একজন মানুষ দিব্য দৃষ্টি লাভ করবে? 

—– কথা বলো না বৎস। চক্ষু মুদিত করো। 

 


৪

ক্ষমা প্রার্থনা

 

 

রণজয়ের চোখের সামনে ফুটে উঠল একটি নগর। দ্রুত গতির যন্ত্র চালিত যান দেখে সে অবাক এবং ভীত হতেই পাশে অঙ্গিরা মধু কণ্ঠে বলে উঠলেন — ভয় নাই বৎস। এক্ষণে আমরা অদৃশ্য। নগরের নাম কলকাতা। পঞ্চসহস্রাধিক বৎসর অতিক্রম করে মনুষ্যজাতি পাপের গহ্বরে কীভাবে নিমজ্জিত আপন চক্ষে দেখ।

রণজয় দেখে। দশবৎসরের বালিকাকে রাক্ষস চিবিয়ে খেয়ে হত্যা করে। মধুযামিনী পালন কালে নববিবাহিতা পত্নী প্রেমিকের সঙ্গে একত্রে অসহায় স্বামীকে হত্যা করে। কেবল হত্যা, কেবল অশান্তি, কেবল অর্থ সম্পদের দিকে নজর … ধনীদের লোলুপ দৃষ্টি আরো ধনলাভের দিকে নিমজ্জিত। পিশাচের মত অট্টহাস্য করে দুইহাতে গলা টিপে হত্যা করছে অসহায় বৃদ্ধ মানুষকে। বলবান সন্তানের হাতে প্রহৃত হচ্ছে জন্মদাতা জনক! রণজয় চিৎকার করে বলে — ফিরে চলুন গুরুদেব। আর পারি না। হে করুণাময় ঈশ্বর! মানুষের এ কি দুর্দশা!

অঙ্গিরা বলেন — বৎস, মানব জাতির এমন অধঃপতনের জন্যে কাকে দায়ী করবে? আজ থেকে পাঁচহাজার বছর আগে একটি অভিযোগ নিয়ে তুমি আমার কাছে এসেছিলে … আর আজ দেখ। মানবের মধ্যেই পিশাচ, অসুর আর দানবের বাস। দেবতা চরিত্র বিলীন প্রায়।

হতভম্ব রণজয় দেখে অবক্ষয়ের সীমায় পৌঁছে যাওয়া মানবরূপী কিট কিলবিল করে নিজেদের হানাহানি করছে, শালীনতা সভ্যতা বিসর্জন দিয়ে উদোম নৃত্য করছে। মা গঙ্গার তীরে এতটুকু ভরসার বাতাস নেই। গরল গরল কেবল গরল। কেন এমন হল? ব্রহ্মাণ্ড ক্ষতিগ্রস্থ করছে নির্বোধ মানব! কেন এমন হল? হে ঋষিবর। চলুন ফিরে যাই সরস্বতী তীরে।

—- বৎস, অতীত বিলীন হয়ে গেছে মহাকালের গর্ভে। কিন্তু, কেন সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেল না সেইটি জানতে হলে আর একখানি ছবি দেখ।

কথা শেষ হওয়া মাত্র দৃশ্যের পরিবর্তন হয়ে দেখা গেল ভিন্ন ভিন্ন তপোবন, আশ্রম জুড়ে আগুন জ্বলছে। ভেসে এল অঙ্গিরার কণ্ঠস্বর — একনিষ্ঠ সত্যান্বেষণ করেছেন বিভিন্ন ঋষি সম্প্রদায়। যেমন, দধিচি, দুর্বাসা, অগস্ত্য, প্রভৃতি জ্ঞানী ঋষিবৃন্দ বিশেষ বিশেষ বিষয়ের উপর সাধনা করতে করতে অমৃতগতি প্রাপ্ত হলেও সাধনা থেমে থাকত না। উদাহরণ স্বরূপ, অগস্ত্য অর্থে একজন ব্যক্তি নন, তাঁর জ্ঞান বহন করে নিয়ে যাচ্ছে যে সমস্ত শিষ্য — সকলেই অগস্ত্য। ওই দেখ… জ্বলছে তাঁর তপোবন। জ্ঞানসূত্রের ধারক পুঁথি জ্বলছে। বিজাতীয় রাক্ষস পিশাচ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ভারতের গর্ব ভারতের রক্ষাকর্তা মহান ঋষিকুল শেষ হয়ে গুরুকুল বিনষ্ট হয়ে বিদেশী আগ্রাসন বৃদ্ধি পাবে। বিজাতীয় ভাষা শিখবে সংস্কৃত ভুলে। এবার বুঝলে? কিভাবে নষ্ট হয়েছে ভারতীয় দর্শন, বেদ, উপনিষদ?

অঙ্গিরা ফিরে এসেছেন বর্তমানে। আবার সেই সরস্বতী তীরে, শান্ত নির্জন তপোবনে, মধ্যাহ্ন পার হয়ে গোধূলির সময়ে অগ্নিহোত্র যজ্ঞ শুরু হয়েছে। প্রতিদিন সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় সোনার তৈরি পাত্রে পবিত্র ঘি আর চাল দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দপ করে জ্বলে উঠল আগুন।
অগ্নি মানে আগুন হোত্র মানে আরোগ্য। ঋষি বললেন — রণজয়, আমি তোমার সঙ্গে শূরসেন রাজ্যে যাব। আগুনের সামনে বসে মন্ত্র উচ্চারণ করলে তৈরি হবে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র। তড়িৎ প্রবাহের স্পর্শে রানিদের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসবে সমস্ত অপরাধের স্বীকারোক্তি।

নত মস্তকে দাঁড়িয়ে রইল রণজয়। সূর্যাস্ত অগ্নিহোত্র মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে। পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার জন্যে জাদুকরী মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে —- হে অগ্নি, জাগ্রত হয়ে রক্ষা কর। এই সমিধ তোমার আধার স্বরূপ। ইহা দ্বারা তুমি প্রদীপ্ত হয়ে আমাদিগকে রক্ষা করো।

ঋষি চক্ষু মুদিত করেছেন। সমস্ত অবয়বে ফুটে উঠেছে দিব্য আভা। ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করল রণজয় —- আমাদের রক্ষা করুন হে মহান ব্রহ্মর্ষি। আপনাদের ক্ষয় নেই লয় নেই। বিপন্ন ভারতবর্ষকে আবার জাগ্রত করুন।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *