স্বপ্ন পূরণ
হিমি মিত্র রায়
চাকরিতে জয়েন করার পনেরো বছর উপলক্ষে পাড়ার মোড়ের বন্ধুদের নিয়ে হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি আর চিকেন চাপের পার্টি দিয়েছে রুদ্র। সান্ধ্য আড্ডাস্থলেরই এক বন্ধু অনন্তদার বাড়ির নিচ তলার একটা ঘর ওর ব্যক্তিগত ব্যবসার কাজে ব্যবহার করে। সেখানেই পার্টির ব্যবস্থা করেছে ওরা। অবশ্য মাঝে মধ্যেই এমন পার্টি লেগেই থাকে। অকেশনটা উপলক্ষ্য মাত্র। আড্ডা আর খাওয়া দাওয়াই আসল। রেস্তোরাঁতেও যায় ওঁরা। তবে এই অনন্তদাদের বাড়ির নিচটা যেন আড্ডার জন্য আদর্শ। সময়ের কোন ব্যাপার নেই। নিজেদের মতো সময় কাটানো যায়। অবশ্য বেশিরভাগের বাড়ি থেকে ২-৩ বার ফোন করে আল্টিমেটাম দেওয়া হলেও প্রত্যেকেই জেনে গেছে এসব আসলে ভয় দেখানোর ফোন, আসলে তারা কিছুই বলবে না। উল্টে পতিদেবরা যতক্ষণ বাড়িতে না থাকে ততই মঙ্গল। এলেই টিভির রিমোট নিয়ে মল্লযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়া। তার চেয়ে যতক্ষণ বাইরে থাকে ততই ভালো।
যার জন্য আজকের এই পার্টি সেই রুদ্রদীপ সামন্তর পরিচয়টা অবশ্য দেওয়া হয়নি। রুদ্রদীপ প্রশাসনিক কর্তা। ডাবলুবিসিএস পরীক্ষা দিয়ে পাস করে এই চাকরিতে জয়েন করেছিল ১৫ বছর আগে। এখন উচ্চস্তরে আমলা হিসেবে কর্মরত। সকলেই রুদ্রকে ভালোবাসে, সমীহ করে খুব। শুধু ওর চাকরির জন্য তা নয়। সকলের ভালো মন্দের খোঁজ রাখে ও, এক কথায় পরোপকারী। পাড়ার বন্ধু-বান্ধবরা কেউ চাকরি করে স্কুলে, কেউবা কলেজে, কেউ প্রাইভেট কোম্পানিতে, কেউবা ব্যবসায়ী। মোটকথা নানান পেশার মানুষ একত্রে। বয়সেও বড় ছোট মেশানো। তাতে অবশ্য ওদের বন্ধুত্বে ছেদ পড়েনি। সেদিন ওই পার্টিতে চিকেন চাপের প্লেট থেকে সবে লেগপিসটা তুলতে যাবে রুদ্র, ওমনি কলিং বেল।
অনন্তদা তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে বলল, আরে সুব্রত দা, কী খবর, অনেকদিন বাদে এলে, এসো এসো।
কান এঁটো করা হাসি দিয়ে সুব্রতদা ঘরে এসে বলল, ও মা, এইযে দেখতাসি ভুল সময় আইসা পড়লাম।
সুব্রতদা কাঠ বাঙ্গাল। এখনো এরকম করে কথা বলে এবং ওর কথাগুলো শুনতে খুব ভালো লাগে। রুদ্ররা বারেবারে শুনতে চায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো ওকে খ্যাপালেও খ্যাপে না। বড় প্রাণ খোলা মানুষ। বিয়েথা করেননি, একাই থাকেন। মাঝে মাঝে রুদ্রদের আড্ডাস্থলে এসে ঢু মারেন। ও আসার পরে আড্ডা স্থানের জৌলুসটা যেন আরো বেড়ে যায়। ওঁর কথাগুলো নিয়েই মজা হয় খুব। তবে সুব্রতদা রোজ আসেন না, হঠাৎ উদয় হন। এই যেমন আজ এলেন।
মোটেই ভুল সময় নয়। দাদা বোসো, কোথায় ছিলে বল তো এদ্দিন?
৫৩-৫৪ বছরের সুব্রতদা চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, আর বইলো না, ওই একটু আর্ত স্যাবা ট্যাবা করলে যদি কিছু পুণ্য কামাইতে পারি, তাই যাই আর কী।
সুব্রতদা ঠিক কী করে তা জানা যায় না। তবে তেমন বলার মত কিছু করে না তা বোঝা যায়। সুব্রতদা এমন একজন যে অসুবিধায় পড়লেও মুখ ফুটে কিছু বলতে চায় না। তাই টাকা-পয়সার দরকার হলেও তা বলবে না রুদ্র জানে। আর নিজে থেকে এইসব মানুষকে সাহায্য করতে চাওয়াও তাঁকে অসম্মান করা হয়।
রুদ্রকে ভীষণ ভালোবাসে সুব্রতদা। বলে খুব ইচ্ছা ছিল বড় সরকারি অফিসার হইবো। কিন্তু উপরআলা সেইটা চায় নাই, আমারও আর হইল না।
তারপর ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে হাসিমুখে বলেন, একদিন তোমার নীল বাতি দেওয়া গাড়িতে চড়ায়ো তো ভাই, বড় শখ হয়। মরার আগে একবার অন্তত চড়তে চাই। চড়াবাতো ভাই?
কি যে বলো না দাদা, যেদিন খুশি। কাল আমি অফিস যাওয়ার পথে তোমায় তুলে নেব, তারপর আমার সঙ্গে অফিস যাবে। ক্যান্টিনে খাওয়াবো আর আমার ড্রাইভার মন্টু তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাবে। কি, রাজি?
সুব্রতদা ওর নিষ্পাপ হাসি মুখটা লুকোতে পারে না। রুদ্রর পিঠে হাত দিয়ে বলে, কাল তো হইব না ভাই, তবে তুমি যে বললা এইটাই বা কে কয়! সবাইকে বলি তোমার কথা।
এইভাবে আড্ডা জমে ওঠে। সুব্রতদা ওর দেশের বাড়ির মজার মজার গল্প করে আর ওরা শুনে হেসে মরে। মাঝেমধ্যে আসে আবার কদিন বন্ধ, এভাবেই চলে। মোটামুটি ১৫ দিনে একবার ঢু মারে সুব্রত দা। এবার ওর না আসার প্রায় একমাস হতে চলল।
বিল্টু বলল, ক ব্যাপার বলতো? হল টা কি সুব্রতদার? শরীর খারাপ হলো না তো?
অনন্তদা বলে, কি জানি, ব্যাটা তো মোবাইল ইউজ করে না, জানবো কেমন করে?
ঠিক তার পরদিন সুব্রতদা একটা ঝোলা নিয়ে হাজির। সেই ঝোলায় কি আছে, বিশাল এক কলার কাঁদি।
এইগুলো কোথা থেকে পেলে সুব্রতদা?
কোথায় আবার, আমাগো কলা গাছে হইছে। এখনকার ওষুধ দেওয়া কলা না। দেখো খাইয়া, চিনির মতো মিষ্টি। তোমাদের জন্যেই আনছি। বাড়ির বাচ্চারা আছে না, ওদের দিবা।
সে তো বুঝলাম। কিন্তু তুমি এতদিন কোথায় ছিলে বল তো, সেই যে হাওয়া হয়ে গেলে!
সুব্রতদা তাঁর স্বভাবসুলভ হাসিমুখে বলল, ওই একটু দিঘা বেড়াইতে চলে গেছিলাম। জগন্নাথ মন্দির হইছে, সেখানে গেছিলাম। জগন্নাথ দেবের দর্শন কইরা আইছি। শান্তি কী শান্তি মনে। আবার কবে যাইতে পারবো কে জানে।
সব ঠিক আছে। কিন্তু তুমি মোবাইল ব্যবহার কর না কেন বল তো? ভাবলাম তোমার কী না কি হয়ে গেল। আরে যোগাযোগ তো করতে পারি অন্তত!
চিনি ছাড়া লিকার চায়ে আয়েশ করে এক চুমুক দিয়ে বলল ও, ওইসব আপদ থাকলে জীবনে অনেক অশান্তি। এই কত ভালো আছি আমি। নিজের ইচ্ছামত চলি ফিরি, কেউ ফোন কইরে তাড়া দেয় না কিছুতে। এই ভাবেই তো হয়ে যাইতেছে, ওই জিনিস আমি কুনোদিন নিবই না।
একজন মাঝবয়সি এমন মানুষকে আর নতুন করে কী বোঝানো যায়! মোবাইল ব্যবহার না করে যদি উনি ভালো থাকেন তাহলে বাকিদের আর কি বলার থাকতে পারে।
তাহলে মোবাইল যখন ব্যবহারই করো না তখন একটা জায়গার বা কারো নাম্বার দিয়ে রাখো সুব্রতদা, প্রয়োজনে তোমার সাথে যোগাযোগ তো করতে পারি! অন্তত তোমার কোন দরকারে আমাদের সাহায্য লাগতেই পারে।
সুব্রতদা রুদ্রর পিঠে হাত দিয়ে বলেন, এই যে এই কথাটা বললা, এইটাই কয়টা লোকে কয় আজকের দিনে? এত বড় অফিসার হইয়াও যে তুমি আমাদের মত লোকের সঙ্গে বইসা চা খাও, আড্ডা দাও এইটাই আমার জন্য অনেক। শুধু একটাই শখ, একদিন ওই নীল বাতি দেওয়া গাড়িতে আমারে চড়াবা। আমিও দ্যাখবো ওই গাড়িতে চইড়া কেমন লাগে, লোকজন কত সম্মান দেখায় আমারও দ্যাখতে ইচ্ছা করে।
আরে কী মুশকিল, এটা কী এমন ব্যাপার সুব্রতদা, তোমাকে তো কবে থেকে বলছি চলো।
এইবার যাবোই যাব। কয়টা দিন একটু সময় দাও। তারপরে যাবোই। এই তোমারে আজ কথা দিলাম।
যথারীতি আবার সুব্রতদা গায়েব। কী যে হয় মাঝে মাঝে, কোথায় চলে যায় জানা যায় না। তবে পাড়ার সঞ্জুর সিগারেটের দোকানে সিগারেট কেনার সময় সঞ্জু বলে, স্যার, আপনাদের আড্ডার ওখানে সুব্রত কাকু আছে না, ওনার খুব শরীর খারাপ।
সেকি গো, আগে বলোনি কেন? তুমি কোথা থেকে জানলে?
আরে আমার শ্বশুর বাড়ির পাড়ায় থাকে তো, এই দুইদিন আগেই তো জানলাম। বউকে বাপের বাড়ি থেকে আনতে গেছি, তখন কথায় কথায় উঠল। আমার শ্বশুরবাড়ির দুটো বাড়ির পরেই থাকে। একবার দেখতে যাবেন নাকি স্যার?
এক্ষুনি আমাকে এ্যড্রেস দাও।
সঞ্জুর থেকে অ্যাড্রেস নিয়ে রুদ্র, অনন্তদা আর বিল্টু চলে গেল সঞ্জুর শ্বশুরবাড়ির পাড়ায়। পাটুলির ওখানে কোথাও একটা ঠিকানা দিল। আজ রবিবার, ছুটির দিন। তাই রুদ্র ওঁর ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছে। ওরও তো ছুটি দরকার। তার মধ্যে ছেলেটা নতুন বাবা হয়েছে, রবিবার দিন ডিউটি করতে ডাকলে ক্ষেপে যাবে। উপরে উপরে কিছু বলবে না কিন্তু ভেতরে ভেতরে রাগ তো হবেই। তাই ওকে আর বেকার ডাকলো না রুদ্র। একটা ক্যাব বুক করে চলে গেল।
সঞ্জু যেটা ঠিকানা দিয়েছিল ঠিক ওখানেই এসে দাঁড়িয়েছে ওরা। শ্রী হরি মিষ্টান্ন ভান্ডার। পাঁচ ছ’ রকমের মিষ্টি রাখা। আর তার একদিকে ৪-৫ পিস ঠান্ডা সিঙ্গারা কাঁচের বক্সের মধ্যে নেতিয়ে পড়ে রয়েছে। ওই ঠান্ডা সিঙারা কেউ একজন খেলে হয়েছে।
একেকটা অ্যাসিড বাল্ব বুঝলি? খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাসিড হবে।
অনন্তদা হাসতে হাসতে বলল।
দোকানদার বসে মোবাইল ঘাঁটছে। ওকে জিজ্ঞাসা করা হল সুব্রত দার বাড়ি কোনটা। ও কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো তারপর দেখিয়ে দিয়ে বলল, সারা জীবন লোকের জন্য করে গেল, কিন্তু বেচারা অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে কেউ দেখার নেই, এই জগতের নিয়ম। যান গে, আপনারা দেখেন গিয়ে।’
আপনি এটা জেনেও কিছু করতে পারলেন না? এখানে বসে বসে মোবাইল ঘাটছেন? কি হয়েছে সুব্রতদার?
ওর উত্তরের আশায় না থেকে রুদ্ররা জোরে হাঁটা দিল ওঁর বাড়ির দিকে। সাধারণ জ্বর জাড়ি হলে তো এভাবে বলত না! ওরা তো তাই ভেবেছে।
রীতিমতো দৌড়ে সুব্রতদার বাড়ির সামনে পৌছে গেল ওঁরা। খুব সাধারণ একটা একতলা এক কামরার ঘর বলা যায়। পাশে লাগোয়া বাড়ি। ভেতরে বড় উঠোন আছে। বোঝাই যাচ্ছে সেখানে অন্যান্য জ্ঞ্যাতিরা থাকে। রাস্তার দিকে একটাই ঘর যেখানে বাইরে একজন লোককে ধোপদূরস্ত পাজামা পাঞ্জাবি পরে ফোনে কথা বলতে দেখা গেল।
এটাই কি সুব্রতদার বাড়ি?
লোকটা ফোন কানে নিয়েই বলল, হ্যাঁ। অসুস্থ। আপনারা কারা?
আর কথা না বাড়িয়ে রুদ্ররা তাড়াতাড়ি ঢুকে গেল, দরজায় ছোট্ট হয়ে আসা মলিন পর্দাখানা সরিয়ে।
স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার ঘরটায় একটাই মাত্র বাল্ব জ্বলছে। বাল্বের পাওয়ারের মতনই ফ্যানের স্পিড। ঘরের মধ্যে এক কোণে স্টোভ, হাঁড়ি কড়াই। একটা ছোট্ট টেবিল তার মধ্যে প্রচুর ওষুধপত্র আর লাগোয়া একটি খাটে পুরো চাদর মুড়ি দিয়ে চোখ বুঁজে যে শুয়ে আছে তাকে সুব্রতদা বলে চেনা যায় না। চোখ মুখ শরীর ফুলে ঢোল।
কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না ওরা। হাঁ করে বোকার মত তাকিয়ে থাকল। একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছিল, তখন বাইরে থেকে লোকটা ফোনে, ‘পরে কথা বলছি’ বলে রেখে ঘরে ঢুকল।
ফোনটা পাঞ্জাবির পকেটে রেখে লোকটা দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল, আমার ছোট ভাই। সৎভাই হলেও ভাই তো ভাই হয় বলুন। মনে হয় না আর কিছু করা যাবে। দুটো কিডনিরই শেষ অবস্থা।
মানে? এভাবে ফেলে রেখেছিলেন বাড়িতে? হাসপাতালেও ভর্তি করেননি?
লোকটা ঠোঁট উল্টে বলল, দেখুন ভাই, পয়সার অভাব সবারই। আমার নিজের বাড়িতেও অনেক অসুস্থ, টানাটানির ব্যাপার। সবারটা যদি দেখতে যেতাম তাহলে হয়েছিল। আপনারা কিছু করেননি কেন?
ছাড়ো অনন্তদা। ওনার মুখ লেগে লাভ নেই। পোশাক দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে পয়সার কতটা টানাটানি।
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করল।
সুব্রতদার কাছে গিয়ে বসলো ওরা। গলার স্বর পেয়ে সুব্রতদা আস্তে করে চোখ খুলে ওই অবস্থায়ও মৃদু হাসলো।
বলল, তোমরা আসছ কষ্ট কইরা?
বুকের কাছটা ভারি হয়ে গেল রুদ্রর। সুব্রতদার মাথায় হাত দিয়ে বলল, এটা ঠিক করলে দাদা? একবার জানাতে পারলে না তোমার অসুখের ব্যাপারে?
ভেঙে ভেঙে সুব্রতদা বলল, কী আর কই! এত তাড়াতাড়ি কিডনি দুইটা খারাপ হইয়া যাবে বুঝতে পারি নাই। কেন এমন হইল কে জানে! ভগবানেরে বোঝা দায়।
কাশতে শুরু করলো সুব্রতদা।
কাশিটা সুব্রতদার ভেতরের প্রাণটুকুও মনে হচ্ছে বের করে দেবে, চোখে দেখা যায় না। রুদ্ররা চেষ্টা করল সুব্রতদাকে জল খাওয়ানোর।
