travel-ghar-hote-du-pa

ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

মানসী গাঙ্গুলী


     “মুকুটটাতো পড়েই আছে, রাজাই শুধু নেই।” নেই রানীও। নামেই রাজবাড়ি। নেই রাজবাড়ির সে জৌলুস, নেই অলিন্দ জুড়ে সুন্দর সুসজ্জিত দাসদাসীদের আনাগোনা। তবু রাজ্যপাটটুকু রয়ে গেছে। রাজবাড়ির তিন বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ সদস্য এখনও জীবিত আছেন যাদের বয়স যথাক্রমে ৭৫, ৮৬ ও ৯৫। যিনি ৭৫বছর বয়সী তিনি ওই রাজবাড়িতেই একটি মহলের দোতলায় বাস করেন। ৮৬ ও ৯৫ বয়সীরা কলকাতায় থাকেন। এসব গাইড হিরন্ময় ভট্টাচার্যের কাছ থেকে জানলাম সেখানে গিয়ে। রাজবাড়ির নাম শুনে যাবার ইচ্ছে বহুদিনের। “ঘর হতে শুধু দুই-পা ফেলিয়া”, তবু যাওয়া আর হয়ে ওঠে না। হল অবশেষে মাঘের মাঝামাঝি পড়ন্ত শীতে, মৃদুমন্দ আবহাওয়ায়। হল আমার মাসতুতো ভাইয়ের আবদারে। বহুকাল বিদেশে থাকার পর ফিরেছে দেশে। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার পান্ডুয়ার কাছে অবস্থিত এই রাজবাড়িটি। সত্যি কত কাছে তবু এতদিন ছিল কতদূরে। হালকা শীতবস্ত্র গায়ে জড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম সকলে। চললাম গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে। অল্পক্ষণেই পথ শেষ। সেটুকুতেও গ্রামের সৌন্দর্য দেখতে বেশ মনোরম লাগছিল। পোঁছোলাম বেলা ১২টা নাগাদ। গাড়ি থেকে নেমে প্রবেশ পথে পা দিতেই এক ভদ্রমহিলা সবার কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দিলেন। পাশেই একটি ছেলে শরবত হাতে প্রস্তুত ছিল। সবার হাতে শরবত ধরিয়ে দিলে তা গলাধঃকরণ করে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। সামনেই ঠাকুরদালান। চারিদিকে প্রচুর ফুলের টব, সামনের বাগানে। শীতের ফুলে ফুলে আলো হয়ে আছে চারিদিক। 

         দুটি ছেলে আমাদের লটবহর নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল। আমরা তাদের পিছনে। দোতলায় উঠে বারান্দা পেরিয়ে চওড়া দালান দিয়ে হেঁটে যাবার সময় দেখলাম প্রতিটি ঘরের বাইরে নামকরণ করা রয়েছে। আমাদের রুমদুটি হল ঠাকুমা ও বড়পিসিমা। ভাইকে ঠাকুমার ঘরটা দিয়ে আমরা বড়পিসিমার ঘরটা নিলাম। দুই ঘরেই একই আসবাবপত্র। পুরনো দিনের কাঠের কাজ করা একটি ডবল বেডের খাট, পালঙ্ক বলে যাকে। দুপাশে দুটো সাইড টেবিল, দুটো স্ট্যান্ড টেবিল-ল্যাম্প। একটা সাইড টেবিলে তিনটি কাচের জলের বোতল, তিনটি কাচের গ্লাস। একদিকে একটা ছোট টেবিল। রয়েছে দুটি সিঙ্গল সোফা, একটা সোফা-কাম-বেড। তিনজনের অ্যাকোমোডেশন। সোফার মাঝে একটা গোল টেবিল। দেওয়ালে রয়েছে টিভি, সামনে অর্ধচন্দ্রাকার একটা গ্রানাইটের টেবিল সুন্দর কাঠের কারুকাজ করা ফ্রেমে বন্দী, দেওয়ালের সাপোর্টে একপায়ে দাঁড়িয়ে। বাঁদিকে কাঠের আলমারি, সেটি আধুনিক ঘাসবোর্ডের, পাল্লায় আয়না লাগানো। তার বাঁদিকে বন্ধ সার্সি জানলার খোপে টেবিল বানিয়ে রাখা আছে চায়ের সরঞ্জাম, ইলেকট্রিক কেটল। ডানদিকে সোফা-কাম-বেডের পাশ দিয়ে বড় বাথরুম। সেখানে একটি আলনা, তাতে দুটি করে বড় টাওয়েল ও ছোট টাওয়েল রাখা। রয়েছে শাওয়ার এনক্লোজার, ফলে বাথরুম জলে জলময় হবে না। বেসিনের ওপরে সেলফে লিকুইড সাবান, শ্যাম্পু, ময়েশ্চারাইজার, হ্যান্ডওয়াশ সবই দেওয়া আছে আধুনিক হোটেলের মত। এ রাজবাড়ি এখন হোটেল, তাই পুরনো ও নতুনের মেলবন্ধন। অতীতে পড়ে থাকলে চলবে না, আধুনিক জীবনযাত্রার উপযোগী করে তুলতে হবে। 

         বর্তমান রাজবাড়ির সদস্যরা নিজেদের ব্যবহারের জন্য কিছু অংশ রেখে বাকীটা এক কর্পোরেট সংস্থাকে দিয়ে দিয়েছেন। ওই বিশাল এলাকা জুড়ে তিনমহলা বাড়ি নিজেরা দেখাশোনা করা বড় সহজ ব্যাপার নয়। তাই এ ব্যবস্থা। বিশেষত বাড়ির পরের জেনারেশনের প্রায় সবাই বাংলার বাইরে রুজিরোজগারের সন্ধানে। এছাড়া ঐতিহাসিক সম্পত্তিগুলোকে পুরাতন হোটেল এবং হোমস্টে-তে রূপান্তরিত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কলকাতার কাছাকাছি হবার জন্য এটি সাপ্তাহান্তিক ছুটি কাটানোর একটি সুন্দর গন্তব্য। আমরাও ছুটেছিলাম সেই ইতিহাসের টানে। ঘরে গেলাম। ঠাকুমার ঘর ও বড়পিসিমার ঘরদুটি পাশাপাশি। বড়পিসিমার ঘরের পাশে রয়েছে ছোটপিসিমার ঘর। দালানেও রয়েছে বসার ব্যবস্থা। রয়েছে টেবিল চেয়ার। দুই ঘরের বোর্ডাররা একসঙ্গে বসে গল্পগুজব করতে পারবে সেখানে। দালানটিতে জানালা-দরজা রয়েছে। দরজা দিয়ে বেরিয়ে বারান্দা পেরিয়ে একটু মুক্ত অঞ্চল। নীল আকাশের নীচে একটা টেবিল ও চারটি চেয়ার পাতা। দেওয়ালের দিকে টবে হলুদ গাঁদা আলো করে রেখেছে জায়গাটাকে। আমরা খানিক বসলাম সেখানে। আমাদের ঘরের উল্টোদিকেও ঠিক একইরকম বারান্দা, তারপর দালান ও তার কোলে ঘর। মাঝে ছোট একটু উঠোন। খানিকক্ষণ বসে প্রায় দুটো নাগাদ উঠলাম খেতে যাবার জন্য। খাবারঘর নীচে, ‘আহ- আহারে’। নীচে নামবার সময় আমরা উল্টোদিকের বারান্দা দিয়ে সেই দালানে গেলাম। সেখানে রয়েছে বড়বৌদির ঘর, ছোটবৌদির ঘর। চলে গেলাম সিঁড়ি দিয়ে নেমে খাবার ঘরে। ডানহাতে অফিস ঘর, বাঁদিকে ক্র্যাফটস শপ। ভেতরে বেশ কয়েকটি টেবিল পাতা চারজনের বসার জন্য। একপাশে একটা বড় টেবিল ১২জনের বসার। টেবিলগুলো সব লাল টেবিলক্লথে ঢাকা। ওপরে ঝাড়-লন্ঠন, আগের দিনের টানাপাখা। আমাদের বসানো হল যে টেবিলে সেখানে দুটো ছোট বোর্ডে লেখা ছিল ঠাকুমা(৩), বড়পিসিমা(৪)। খাবার এল কাঁসার থালায়, সঙ্গে ছোট ছোট কাঁসার বাটিতে তরিতরকারি। নানাবিধ পদ। থালার মাঝে ভাত, তার মাঝখানে ছোট্ট বাটিতে ঘি, দুটো লুচি, বেগুনী, শুক্তো, মাছের মাথা দিয়ে ডাল, আলু কুমড়োর তরকারি, ফুলকপি আলু পোস্ত, পাবদা মাছের ঝাল, খাসির মাংস, কাচের বাটিতে চাটনি, দই, শেষে পান। চারটে থালা সেজেগুজে এল আমাদের চারজনের জন্য। আগে থেকে টেবিলে রাখা ছিল ছোট ছোট কাঁসার গ্লাসে জল। একটি ছোট কাঁসার থালার ওপর একটি বড় কাঁসার গ্লাসে কাঁটা-চামচ, প্লেটে টিসু-পেপার। অনুষ্ঠানের ত্রুটি নেই। দেওয়ালে টাঙানো আছে ১৯৩৫ সালের রাজবাড়ির কোনও সদস্য দেবনারায়ণ কুন্ডুর বিবাহের খাদ্য-তালিকা।


     অতরকম পদ, খাওয়াটা বেশিই হয়ে গেল। খেয়েদেয়ে আমরা রাজবাড়ির উল্টোদিকের শিবমন্দিরে গেলাম। দেবাদিদেব মহাদেব ও তাঁর ষাঁড় রয়েছে সেই মন্দিরে। কুন্দ্রাদের আরাধ্য দেবতা কিন্তু নিজেদের ওই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জনতার দাবী মেনে তাদের বৈষ্ণব-ধর্ম গ্রহণ করতে হয়েছিল। রাজবাড়ির মন্দিরে তাই শ্রী শ্রীধর জিউকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছিল আর মহাদেবের স্থান হয়েছিল রাজবাড়ির চৌহদ্দির বাইরে। আমরা মহাদেবকে প্রণাম করে ভেতরে ঢুকলাম। এরপর ওপরে গেলাম একটু শুতে কিন্তু মিনিট ২০ পরেই ডাক এল। ৪টে থেকে গাইড রাজবাড়ি ঘুরিয়ে দেখাবে তেমনই কথা ছিল। যারা সেদিন রাজবাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন সবাই গিয়ে হাজির হলেন ঠাকুরদালানের সামনে। শুরু হল গাইডের বক্তৃতা। অব আয়েগা মজা। গাইড তো রাজবাড়ির ইতিহাস শুরু করল। এরা কোথায় থাকতেন, কোথা থেকে এলেন, কতদিন আগে তারা এখানে এসে থাকতে শুরু করেন। গাইডের বলার ভঙ্গি ও ভুলভাল ইংরেজি মিশ্রিত কথা সবাইকে বেশ মজা দিচ্ছিল। আমরা সবাই বেশ উপভোগ করতে লাগলাম। ওদিকে ‘সি করুন’, ‘লুক করুন’ শুনে সবাই হাসছি আমরা। হঠাৎ চিৎকার করে ‘ফলো মি’ করে এগোতে শুরু করলে আমরা তাকে ফলো করতে লাগলাম। আমরাও তার সঙ্গে মজা করছিলাম কিন্তু তাতে সে মোটেই বিরক্ত নয় বরং মনে হচ্ছিল সে-ও বেশ উপভোগ করছে। স্থানীয়রা এই জায়গাটিকে বর্গীডাঙা বলে থাকে। ঐতিহাসিক মতে, এককালে বাংলা আক্রমণকারী মারাঠা লুন্ঠনকারীরা বাংলায় এসে লুন্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাত। তাদের স্থানীয়ভাবে বর্গী বলা হত। বাংলার মানুষ তাদের ভয়ে সদা তটস্থ হয়ে থাকত। মহিলারা দুপুরে বাচ্চাদের ঘুম পাড়াবার সময় ভয় দেখিয়ে গান জুড়ে দিত, “খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গী এল দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে?” এইধরনের অনেক বর্গী এখানে বসতি স্থাপন করেছিল, তাই একে বর্গীডাঙা বলা হয়। ইটেচনা রাজবাড়ির ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে এই বর্গীডাঙার সঙ্গে। বর্গীর দল বারবার বাংলা আক্রমণ করত চৌথ আদায়ের জন্য অর্থাৎ তারা পরাজিত জনগণের কাছ থেকে কর হিসাবে ফসলের এক-চতুর্থাংশ বা তার সম-মূল্য আদায় করত। ধনসম্পত্তি আদায় করে আবার ফিরে যেত নিজ দেশে। এইধরনের অনেক বর্গী তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে এই বঙ্গদেশে। তারই একটি উদাহরণ এই ইটেচনা রাজবাড়ি। এটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কুন্দ্রারা। এই কুন্দ্রা থেকেই পরে কুন্ডু পদবী এসেছে। শৈব্য হওয়া সত্ত্বেও বৈষ্ণব ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে কুন্ডু উপাধি গ্রহণ করেছিলেন এবং স্থানীয় জমিদার হয়েছিলেন। রাজবাড়িটি ১৭৬৬ খৃষ্টাব্দে শ্রী সফল্য নারায়ণ কুন্ডু দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। ২০১২ সালে কুন্ডুদের ১৪তম প্রজন্ম দ্বারা এটিকে বর্তমান রূপে সংস্কার করা হয়েছে। সবচেয়ে সফল ছিলেন নারায়ণ কুন্ডু। তখন এই বাড়িকে বলা হতো বর্গীবাড়ি। রাজবাড়িটি ৮একর বিস্তৃত জমির উপর নির্মিত এবং বাগান ও পুকুর দ্বারা বেষ্টিত। রাজবাড়িটি প্রাসাদ এবং ৩টি স্বতন্ত্র অংশে বিভক্ত। 

১) দেবমহল বা মন্দির এলাকা। দেবমহলে কুন্ডুদের ইষ্ট দেবতা শ্রী শ্রীধর জিউ, মন্দিরের ভেতরে থাকেন। মন্দিরের সামনের বিশাল প্রাঙ্গণে এখনও দোল-উৎসব এবং জন্মাষ্টমীর সময় ভক্তরা সমবেত হন।

২) অন্দরমহল, যেখানে মহিলারা বাস করতেন এবং বাইরের লোকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।

৩) বাহির মহল বা বাইরের অংশ, যেখানে বাড়ির পুরুষেরা বাস করতেন বা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে যেতেন। এই কক্ষগুলির নামকরণ করা হয়েছে পুরুষ আত্মীয়দের নামে। এখানে ৭টি কক্ষ রয়েছে। প্রাচীন আসবাবপত্রগুলি সুন্দরভাবে সংরক্ষিত আছে। 

       বর্তমানে বাড়িটি একটি হেরিটেজ হোটেলে রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে পর্যটকদের থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। কলকাতা থেকে ৯০কিমি দূরে এই রাজবাড়িটি শান্ত পরিবেশ, অতীতের অনবদ্য স্থাপত্য এবং ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের জন্য সপ্তাহান্তে ঘুরে আসার একটি আদর্শ স্থান। ইচ্ছে করলে থাকা যায় অথবা সারাদিন ঘুরে লাঞ্চ করে ফিরেও যাওয়া যায়। একদিকে পুরনো দিনের আসবাবপত্র, অন্যদিকে আধুনিক সুযোগ সম্বলিত বিভিন্ন ধরনের ঘর এখানে রয়েছে। রাজবাড়িটিতে মোট ১৪টি ঘর, তার মধ্যে ৪টি মাটির ঘরও রয়েছে। অতিথিদের গ্রামের মত পরিবেশ প্রদানের জন্য বাগানের ভেতর এই চারটি কুঁড়েঘর তৈরি করা হয়েছে। মাটির ঘরগুলির নাম যথাক্রমে অপরাজিতা, মাধবীলতা, কনকলতা, ঝুমকোলতা। যে ঘরটির নাম অপরাজিতা, সেই ঘরে ঢোকার জন্য একটি আর্চ করা গেট আছে, তাকে জড়িয়ে রয়েছে অপরাজিতা গাছ। এইভাবে প্রতিটি ঘরের নামকরণের সঙ্গে মিলিয়ে গাছ বসানো আছে। তাই দেখেই চেনা যাবে নিজের ঘরটি। এই ঘরগুলি মূল প্রাসাদ থেকে একটু দূরে। বাগান পেরিয়ে পুকুরের পাশ দিয়ে যেতে হয়। বাগানে সাপখোপ বেরনো বিচিত্র নয়। মূল প্রাসাদটির ঘরগুলিও বিভিন্ন সাইজের। প্রাচীন চওড়া দেওয়াল, উঁচু কড়ি-বরগার ছাদ, বিরাট নাটমন্দির, বড় বড় ঝাড়বাতি ও বিরাট বিরাট বাতিস্তম্ভ দিয়ে সাজানো গোটা রাজবাড়ি। এখানে বাংলা, হিন্দী বহু সিনেমার শুটিংও হয়েছে। বাংলা সিনেমা ‘গয়নার বাক্স’এ কঙ্কনা সেনশর্মা যে পুকুরঘাটে বাসন মাজছিল বা মৌসুমি চট্টোপাধ্যায় ভূত হয়ে যে গাছে বসে পা দোলাচ্ছিল, তা এখানেই, এই রাজবাড়িতেই।


এই বাড়ির আনাচকানাচে লুকিয়ে আছে ইতিহাস। বাইরের অংশে রয়েছে কাছারিবাড়ি, হিসেবের ঘর। ভিতরে অন্দরমহল। সেখান থেকে বাইরেটা দেখা গেলেও বাইরে থেকে ভেতরটা দেখা যায় না। এমনকি ছাদেও রয়েছে উঁচু পাঁচিল। মেয়েরা ছাদে উঠলে বাইরে থেকে কেউ তা দেখতে যাতে না পায় সেইজন্য। গাইডের সঙ্গে ছাদে গেলাম। সিঁড়ির মুখে লেখা ‘স্বপ্নের সিঁড়ি’। এই রাজবাড়িটি প্রথাগত বাঙালি এবং ঔপনিবেশিক শৈলীর সংমিশ্রণে তৈরি। এখানে পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে রাজকীয় ঘর ও খাবারের ব্যবস্থা। গাইড আমাদের ঘোরাতে ঘোরাতে নিয়ে গেল নাচঘরে। নাচঘর আগের মত সজ্জিত নেই যদিও ‘হাজারটাকার ঝাড়বাতিটা’ যেটা রাতটাকে দিন করে দিত, সেটি আজও স্বমহিমায় ঝুলে রয়েছে ছাদ থেকে। রয়েছে বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্র ঘরের বিভিন্ন কোণায়। চোখ বুজে সেই আসরটার কথা চিন্তা করতেই যেন শুনতে পেলাম নুপুরের আওয়াজ, তবলায় চাঁটি। চোখ খুলে বাস্তবে এলাম। সত্যি রাজারাজড়ারা তখন জীবন কাটিয়েছে বটে। নাচঘরের পাশের একটি ছোট ঘরে রাখা রয়েছে তৎকালীন রাজবাড়ির রসুইখানায় ব্যবহৃত বিশাল বড় বড় বাসন। একসঙ্গে কয়েকশো লোকের রান্না করার মত কড়াই, হাঁড়ি, গামলা, হাতা-খুন্তি, হামানদিস্তা। সেগুলো নিশ্চয়ই তখন রসুইঘর বা তার পাশের কোনো ঘরে থাকতো, বর্তমানে সেগুলি নাচঘরের পাশে স্থান পেয়েছে। আবার নাচঘর যখন রয়েছে গুমঘর তো থাকবেই। যেসব সৌভাগ্যবতী মহিলা রাজার বিশেষ কৃপাধন্য হয়ে রাজার সান্নিধ্য লাভ করেছিল, তাদেরই দেহে প্রাণের সঞ্চার টের পেলেই তার স্থান হতো গুমঘরে। খাল্লাস। সেই গুমঘরটির মধ্যেকার কুয়া বুজিয়ে সেটি বর্তমানের চা-ঘর হয়েছে। তার পাশ দিয়ে এগিয়ে ছিল তখনকার আস্তাবল। ৩০০ ঘোড়া থাকতো সেখানে। সন্ধে ৬টায় একটু অন্ধকার হতেই শুরু হল নাটমন্দিরে পুজো। সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ পুরোহিতমশাই পট্টবস্ত্র পরিধান করে উপস্থিত। শ্রী শ্রীধর জিউয়ের মূর্তি রয়েছে সেখানে। পুরোহিতমশাই পুজো করলেন, শেষে আরতি হল, তার সঙ্গে বাজনা বাজল। খোল, করতাল, ঘড়ি, ঘন্টা — অপূর্ব এক পরিবেশ। 

আমরা পবিত্র পঞ্চপ্রদীপের তাপ মাথায় নিলাম। এরপর প্রসাদ নিয়ে গেলাম চা-ঘরে গাইডের কথামত। গাইড আমাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই গুমঘর বনাম চা-ঘরে নিয়ে গেল চা খাওয়াতে। সেখানে এক বংশীবাদক বসে বসে বাঁশি বাজিয়ে শোনালো বিভিন্ন গানের সুরে। এছাড়া রাজবাড়ির বিভিন্ন মহলে কোথাও সানাই, কোথাও সেতার বা সরোদ বেজে চলেছে সারাদিন ধরেই। আমরা নিজেদের ঘরে গিয়ে গল্পগুজবে মেতে উঠলাম। রাত ১০টা বাজলে নিচে খেতে গেলাম। আমরা কী খেতে চাই জেনে গিয়েছিল রুমে এসে। সেইমত খাবার রেডি কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি, তাই অনেক বেশি খাবার অর্ডার দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। যাইহোক, খাবার খেয়ে উপরে এলাম। এই বারবার ওপর-নিচে যাওয়া আসাটাই ছিল কষ্টকর। রাজবাড়ির তরফে এটা ভাবা দরকার। অনেকেরই এখন পায়ের সমস্যা। তাছাড়া বয়স্ক মানুষজনও আছে। তাই লিফট থাকা বিশেষ জরুরি। রাজবাড়ির ফটক রাত ১১টায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১১টার পর ঘরের বাইরে ঘুরে বেড়ানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাজবাড়ির মধ্যে জোরে কথা বলা, ও অকারণ অপরিচ্ছন্ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এখানে পোষ্যপ্রাণী কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। জরুরি পরিস্থিতিতে সেবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যায়। পূর্ব বুকিং ছাড়া ইটেচনা রাজবাড়িতে প্রবেশ সম্ভব নয়। এটি গ্রামের একটি বাড়ি যা গাছপালা ও জলাশয়ে ঘেরা। এখানে মশা, পোকামাকড়, টিকটিকি এবং কিছু সরীসৃপ থাকা বিচিত্র নয়। মাসে দুবার পেশাদার কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রক কোম্পানির মাধ্যমে বাগান এবং কক্ষগুলির পরিচর্যা করা হয়। তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যেমন সাপের কামড়-এর জন্য কতৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। এসবই গাইডের কাছে শোনা। তার মাধ্যমে শতাব্দী প্রাচীন এই রাজবাড়ি সম্বন্ধে অনেক কিছু জানলাম। 

        শুতে রাত ১২টা বেজে গেল। শুয়ে তো পড়লাম। ঘর অন্ধকার হতেই মনে হল বড়পিসিমা আবার তাঁর বিছানায় শুতে আসবেন না তো? বলা যায় না। একজীবনে মানুষের সব সাধ সবসময় পুরণ হয় না। যদি মৃত্যুর আগে কোনও অতৃপ্তি তাঁর থেকে যায়, তবে সেই অতৃপ্ত আত্মার ঘুরেফিরে আসা মোটেই বিচিত্র নয়। এইসব ভাবতে ভাবতে জোর করে চোখ টিপে শুয়ে আছি। চোখ খোলার সাহস নেই। তবে ওই পর্যন্তই। বেশি কিছু ভাবনা মনে আসেনি, ঘুমিয়ে পড়েছি অল্পক্ষণের মধ্যেই। ভোরের আলো ফুটতেই মৃদু সানাইয়ের আওয়াজ ঘুমের মধ্যেই কানে প্রবেশ করে এক সুন্দর আমেজের সৃষ্টি করে। ৭টা বাজতেই দরজায় নক করে বেডটি চলে এল। চা খেয়ে আমরা রেডি হয়ে নিলাম। ঠিক ৮.৩০টায় চলে গেলাম খাবার ঘরে ব্রেকফাস্ট করতে। আগের রাতেই মেনু জেনে রেখেছিল। সেইমত খাবার একদম রেডি। কচুরী, আলুরদম, মাখা সন্দেশ, কলা, ডিমের পোচ ইত্যাদি নানাবিধ সহযোগে প্রাতঃরাশ সেরে আমরা বিদায় নিলাম। কর্মীরা অনেকেই এসে বিদায় জানিয়ে গেল। আমার কথাটিও এখানেই ফুরালো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *