পশ্চিম সিকিমে, ঈশ্বরের নিজস্ব বাগানে

পশ্চিম সিকিমে, ঈশ্বরের নিজস্ব বাগানে
তনুশ্রী পাল
পৌনে ন’টায় শংকরদার লালরঙের অল্টো আমাদের পৌঁছে দিল শিলিগুড়ির সেবক রোডে জোরথং বাসস্টপে। সকালবেলায় বাড়ির দোরগোড়ায় এসে হর্ণ বাজিয়েছিলেন শংকরদা। রেডিই ছিলাম, ছোটদুটো রুকস্যাক আর মায়ের একটি ছোট ব্যাগ সমেত তিনজনে উঠে পড়ি গাড়িতে। আজ সকালের আলোর রঙ বড্ড মিঠে। নৈমিত্তিক গেরস্থালী থেকে দু’চারদিনের ছুটি নিয়ে প্রকৃতিমায়ের কোলের কাছটিতে বসবার আয়োজন হলেই আকাশ-বাতাস-মাঠ-ঘাট- অরণ্য সবই অনেকবেশি অপরূপ আর মিঠে হয়ে ওঠে; মনও তখন বড্ড নরম! আসলে আমাদের রক্তেই তো আবহমানের যাযাবর বৃত্তি। মানুষ ঘর বাঁধতে শিখল তো সেদিন!
শিলিগুড়ির জোরথং বাসস্টপে পৌঁছতেই জোরথং যাবার একটি জিপ ছেড়ে গেল। লম্বাটে জিপে দশজনের বসার সিট। সিট ভরলেই জিপ ছাড়বে নইলে কিন্তু অপেক্ষার প্রহর গুণতে হবে বসেবসে। পরের জিপটিতে তিনটে সিট বুক করলাম আমরা, ১৫০/ টাকা প্রতি সিট। মালপত্র উঠে গেল জিপের মাথায়। দশজন যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে গাড়িটি। আমরা এধারে ওধারে ঘোরাফেরা করি, চা পান করি, অপেক্ষা করি। শেষে বেলা এগারোটা নাগাদ আমাদের যাত্রা শুরু হল, দশজন যাত্রী ও তাদের লটবহর সমেত। শিলিগুড়ি থেকে জোরথাং প্রায় ৮৩ কি মি পথ। পশ্চিম সিকিমের গুরুত্বপূর্ণ শহর জোরথাং, দার্জিলিংয়ের ৩০ কিমি উত্তরে এর অবস্থান। জোরথাং স্ট্যান্ড থেকেই রিসোর্টের পাঠানো গাড়িতে সওয়ার হব আমরা। ওখরের নিকটবর্তী ৭মাইল, সাপ্রে নাগি নামের ছোট্ট এক লোকালয়ে ম্যাগনোলিয়া রিসোর্ট। আজ রাতে সেখানেই থাকব, আগামীকাল সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ব ভার্সের উদ্দেশ্যে। হিলে পর্যন্ত রিসোর্টের গাড়িতে তারপর ভার্সে পর্যন্ত অরণ্যময় পাহাড়ি পথে ট্রেক করে যাওয়া। সবই বুক করা হয়েছে। সুন্দরকে পেতে চাইলে তপস্যা তো করতেই হবে।
যাইহোক আপাতত শিলিগুড়ি ছাড়ল যাত্রী বোঝাই আমাদের জিপটি। জানালার ডানধারের সিট পেয়েছি। খানিক পরেই ডানধারেই তিস্তাকে পাবো। বাঁয়ে থাকবে পাহাড়ের দেওয়াল। জানালায় চোখ পেতে, মন পেতে বসি। রোদ-ঝলসানো শহর ছাড়িয়ে, শহরতলী-ইতস্তত ঘরবাড়ি, দোকান বাজার, শালুগাড়া মনাস্ট্রি ছাড়িয়ে মিলিটারি ব্যারাক, ফরেস্টের কোয়াটার; তারপর শুরু হল দিঘল শাল-সেগুন আর চেনা-অচেনা হাজার বৃক্ষের সবুজে সবুজ ‘মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঙ্কচুয়ারি’। অরণ্যকে দুপাশের রেখে মাঝে সোজা সিঁথির মতো পথ চলে গেছে সেবক পাহাড়ের গা বেয়ে। মাথার ওপর নীল আকাশের চাঁদোয়া, এরপর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। যে পথের প্রতিটি বাঁকে রোমাঞ্চ। ডাইনে পান্না সবুজ তিস্তার জল,পাহাড়ের ছায়া বুকে ধরে তার রঙ কেমন গভীর, অতল! সে জলে মৃদু ঢেউ, প্রকৃতি প্রেমিকের মনে হবে একবার এই অতুলনীয়াকে স্পর্শ করে আসি। বাঁয়ে প্রাচীন গাছ, শ্যাওলা ঢাকা বড় বড় বোল্ডার, ঝোপঝাড়, তারই মাঝে পথ করে নৃত্যছন্দে নেমে এসেছে শীর্ণ জলধারা। বর্ষায় অবশ্য তার রূপ যাবে পাল্টে।
পথের বাঁ-হাতে পাহাড়ের ওপর সেবক কালীবাড়ি। ধাপে ধাপে উঠে গেছে সিঁড়ি। নীচে গাড়ির মেলা, পুজো উপকরণের ছোটছোট দোকান, ভক্তজনের ভিড়। এছাড়াও এই ১০নং জাতীয় সড়ক সদাই ব্যস্ত। সিকিম, দার্জিলিং সমেত অজস্র ট্যুরিস্ট স্পটে যাওয়া যায় এ পথ ধরে। পাহাড়ি খাদের ধারের গার্ডওয়ালে বসে আছে ছানাপোনা সহ বানর পরিবার; যাত্রীরা ছোলা, বাদাম, কলা দিলে হাত বাড়িয়ে নিয়েও নিচ্ছে। ডানধারে তিস্তার ওপরে সেবক করোনেশন ব্রিজটি ছবির মতো সুন্দর। পাশেই অজস্র হোটেল, মনপসন্দ খাবারের অভাব নেই। ছোট্ট একটা ডে-আউটের জন্যে চমৎকার জায়গা।
আমাদের শেয়ারের জিপ এখানে থামবে না। পাহাড়ের গায়ে জড়িয়ে থাকা ময়ালের মতো কালো পিচের রাস্তা ক্রমাগত পাক খেয়ে, কখনও সেতু পেরিয়ে কখনও খাদের কিনারা ঘেঁষে চলছে। চোখে পড়ে মাঝেমধ্যে ছোট্ট পাহাড়ি হাট, লোকালয়, কাঠের দোতলা বা একতলা বাড়ি, পাশে পাশে ছুটতে থাকে রহস্য রঙিন তিস্তা,তার বুকে সবুজ পাহাড়ের প্রতিবিম্ব! কালিঝোরা পেরিয়ে জিপ ছোটে, একটানা গিয়ে থামে লোহাপুলে, এখানে লাঞ্চ। আমাদের মতোই প্রচুর গাড়ি এসে থেমেছে এখানে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রেস্তোরাঁ, আমরা নিরামিষ খাবার নিলাম। গরম ভাত, ডাল, আলুভাজা, ছোলা-আলুর তরকারি, আলু-ফুলকপির ডালনা সঙ্গে পেঁয়াজ আর আচার। মাত্র সত্তর টাকায় এতকিছু। মালকিন হাসিমুখে ভিড় সামলাচ্ছেন, জনা চারেক কর্মচারী খাবার পরিবেশন করছেন, টেবিল পরিস্কার করছেন। কাচের জানালার ওধারে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে খাওয়া শেষ করে আবার যাত্রা শুরু। মেল্লি-নয়াবাজার রোড ধরে গাড়ি চলছে।
সিকিম আর পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় দাঁড়িয়ে রামমাম নদীটির অনেকটাই দার্জিলিং জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। পশ্চিমবঙ্গের খুব গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোলিক প্রজেক্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। রামমাম নদী সিঙ্গালিলা পর্বত রেঞ্জ থেকে উৎপন্ন হয়ে পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে জোরথাংয়ের কাছেই রঙ্গিতের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। দুই নদীর মিলনস্থলটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরিসীম। পশ্চিমবঙ্গ আর পশ্চিম সিকিমের সীমানায় তিস্তার ডান তীরে চমৎকার ছোট্ট শহর মেল্লি। এখানে তিস্তায় ওয়াটার স্পোর্টসের ব্যবস্থা আছে। দেশি-বিদেশি প্রচুর এডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ ভিড় করে এখানে, তিস্তার খরস্রোতে র‍্যাফটিং অনেকের প্রিয়। মেল্লি থেকে জোরথাং প্রায় ১৮ কিমি। পথের কিনারে বিছিয়ে রাখা পাহাড়ের রূপ দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম জোরথাং বাসস্টপে। আবহাওয়া খুব মনোরম লাগছে না, বেশ একটু গরমই।
মালপত্র নামাতেই এগিয়ে এলেন দাওয়া ডি শেরপা। হাসিখুশি মানুষটি নিজের পরিচয় দিতেই আমরা খানিক এগিয়ে রাস্তার ধারেই রাখা ওনার মারুতি ভ্যানে উঠে বসি। উনি আমাদের পৌঁছে দেবেন সাংগে শেরপার ‘ম্যাগনোলিয়া’ ভিলেজ হোমস্টে তে। ওখরের কাছেই এই হোমস্টে। এখান থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিমি, সময় লাগবে দেঢ়ঘন্টার মতো। ড্রাইভার সাহেব দাওয়া শেরপা হাসিখুশি, আলাপী। তিনি জানান, আমরা চাইলে পথের কাছাকাছি দর্শনীয় যা আছে সবই দেখাবেন, আমরা এককথায় রাজি। গাড়ি থামল ‘দ্রামদিন রোজ ভিলেজে’। এটি বিশাল এক সাই মন্দির। ঝকঝকে সুন্দর সে মন্দিরে চারদিকে প্রচুর ফুলের গাছ। এরপর সোজা সোমবারিয়া বাজারে গাড়ি দাঁড়াল, এখানে মোমো আর চা খেয়ে বাজারে একটু ঘুরে বেড়ালাম। এই অপরাহ্ন বেলায় বেশ জমজমাট হাট বসেছে। একটু ঠান্ডাও মালুম হচ্ছে ,সবাই একপ্রস্থ গরম পোশাক পরে নিলাম। সোমবারিয়া থেকে ম্যাগনোলিয়া হোমস্টের দূরত্ব প্রায় সাড়ে এগারো কিমির মতো জানালেন দাওয়া দাদা। পথের ধারেই ইতস্তত ফুলেভরা গুরাসের গাছ দেখে খুব ভাল লাগলো।
বিকেল গড়িয়ে গেছে অনেকটাই, আমরা পৌঁছে গেলাম ম্যাগনোলিয়া ভিলেজ হোমস্টে। রাস্তা থেকে অল্প নেমে প্রচুর ফুল আর নানা প্রজাতির ক্যাকটাস আর প্রশস্ত উঠোন সমেত কাঠ আর টিনের দোতলা বাড়ি। বাড়ির চালা কচিসবুজ রঙের, নানা রঙের ব্যবহারে দোতলা আবাসটি বেশ পুতুলের গৃহ যেন! দাওয়া জি ওনার গাড়িটি উঠোনের একধারে রাখলেন। আমাদের ব্যাগ নামিয়ে নিয়ে সামনের রুমে রেখে দিলেন ওনারা। কিন্তু সাদরে আমাদের নিয়ে চললেন উঠোনের বাঁ-ধারের বাঁশ, খড় আর মাটির তৈরি একটি কুটীরের দিকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৬০০ ফিট উচ্চতায় ঠান্ডা কিছু কম নয়। সারাদিনের জার্নিতে শরীরও ক্লান্ত, এখন একটু বিশ্রাম নিতে পারলে ভাল হতো; কিন্তু এনারা আবার খড়মাটির ঘরটির দিকে কেন নিয়ে যাচ্ছেন, বুঝতে পারিনা। কিন্তু ঘরটিতে ঢুকে এককথায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। রিসোর্টের প্রধান সাংগে শেরপা জানান তার হোমস্টের সব অতিথিকেই এঘরে আগে নিয়ে আসেন। শেরপাদের ট্রাডিশনাল জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি দিয়ে ঘরটি সাজানো, ঘরটির এককোণে মাটির চুলোয় কাঠকুটোর দাউদাউ আগুন, ঘরের ভেতরে ভারি চমৎকার ওম তৈরি করেছে। আরামপ্রদ উষ্ণতায় শরীর আরাম পায়।
ঘরের প্রতিটি জিনিস কৌতূহলী করে তোলে। শেরপাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে এই প্রথম পরিচয় ঘটল অভূতপূর্ব এবং অত্যন্ত আন্তরিক এক পরিবেশে। তাঁদের অতিথি বাৎসল্যে ও প্রীতিপূর্ণ ব্যবহারে দ্রুতই কেটে গেল সদ্য পরিচয়ের আড়ষ্টতা। দূর হয়ে গেল সারাদিনের ক্লান্তি। ওই মাটির ঘর, ওই কমলা আগুনের অম্লান বিভা, ওই চমৎকার সান্ধ্য আসরটির উজ্জ্বল স্মৃতি চিরকালের জন্য মনের মণিকোঠায় মহা মূল্যবান রত্নের মতো জমা রইল। মনে হচ্ছিল ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক ইত্যাদির যতই পার্থক্য থাকুক, পৃথিবীর সব মানুষই আসলে সবার আত্মীয়ই।
আড্ডায় সামিল হলাম ড্রাইভার দাদা দাওয়া ডি শেরপা, হোমস্টের মালিক সাংগে শেরপা, মালকিন ছিরিং লামু আর আমরা তিনজন। এঁরা সবাই বুদ্ধিস্ট জানলাম। শেরপা রীতি অনুসারে বসবার পরে জলের গ্লাস এগিয়ে দিলেন ছিরিং, গুনগুন করে কি একটা গান গাইতে গাইতে চা দিলেন আমাদের সবাইকে। গানের কথাগুলো অনেকটা এরকম শোনাল ‘সে গেকারা পেজে, ফোলা কাটেন…’ অনুরোধ করাতে সাংগে দাদা গানের অনুবাদ করলেন ইংরেজিতে ‘নতুন অতিথি তুমি ভগবানের মতো, তুমি এবারে চা পান কর’। চা পরিবেশিত হল বিশেষ কাপে। তাঁদের রীতি অনুযায়ী কাপের তিনটি জায়গায় একটু বাটার বা ঘি লাগিয়ে তারপর চা পরিবেশিত হয়। চায়ের সঙ্গে দেওয়া হল ঘরে তৈরি শুকনো খাবার ‘খাবজে’ খানিকটা বিস্কিটের স্বাদ যেন। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে আবার গল্প শুরু হয় সে ঘরে বসে। মা অবশ্য রুমে গিয়ে লেপের তলে আশ্রয় নেন মুড়ি সব্জিতে রাতের আহার সেরে। বড় একগ্লাস ভরে ঘরের গরুর খাঁটি দুধ নিয়ে আসেন ছিরিং মায়ের জন্যে। ‘একটা কাপে জল মিশিয়ে অল্প করে দিন, এতটা উনি সহ্য করতে পারবেন না’ বলি ছিরিংকে। সঙ্গে সঙ্গেই সে বাড়ির নিচের ধাপে নেমে তার রান্নাঘর থেকে কাপ নিয়ে আসে। ভারি মিষ্টি আর চটপটে মেয়ে সে, গল্পে গল্পে জেনে নিই বছর চোদ্দের তাদের একটি ছেলে আছে, সে হস্টেলে থেকে পড়াশুনো করে। বয়স্ক শ্বশুর শাশুড়ি আছেন।
রাত বাড়ছে, ঠান্ডাও। তবে সেই বাঁশের বেড়া, খড়ে ছাওয়া ঘরের কাঠের উনুনের ওম জড়িয়ে বসে স্থানীয় জনপ্রিয় পানীয় মিলেট দিয়ে তৈরি ছাংয়ে চুমুক দিতে দিতে গল্প চলে, বাইরের ঠান্ডা আমাদের ছুঁতেই পারেনা। বাঁশের গ্লাসের মতো পাত্রটিকে স্থানীয় ভাষায় ডুংরো বা তোম্বা বলে। বাঁশের স্ট্র বা পিপসিং দিয়েই পান করতে হয় এই পানীয়, মাঝে মাঝেই গরমজল ঢেলে দিতে হয় ডুংরো বা তোম্বার মধ্যে। বেশ ভাল লাগল এই কবোষ্ণ পানীয়। এই ট্রাডিশনাল পানীয়টি পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানেও লাগবেই, সে বিয়ের সম্বন্ধ বা তাদের নববর্ষ উৎসব (১৪/১৫ই ফেব্রুয়ারী) এরকম যে কোনও অনুষ্ঠান হতে পারে। সুন্দর করে সাজিয়ে ডিনার হাজির করলেন ছিরিং। দেখে ভাল লাগলো সাংগেদাদা স্ত্রীকে সাহায্য করছিলেন। রান্নাঘরটা একধাপ নীচে। ডাল, আলুভাজা, পাঁপরভাজা, ঢেকিশাক আর আলু দিয়ে বানানো সব্জিটা চমৎকার! আর চিকেন। খেতে খেতেই নানা গল্প শুনি। ঘরের ভেতর সাজানো বিভিন্ন ধাতু ও বাঁশের তৈরি তৈজসগুলোর নাম জেনে নিই। যেমন ফানেলের মতো দেখতে বাঁশের ছাপপানি বা ছাঁকনি। বাঁশের ও কাঠের লম্বাটে বাটার মেকার, লা-জুম। তামার জলের পাত্র গাগরি, পেতল বা তামার ছোট জলের পাত্র লওটা। সব্জি বা অন্য কিছু রাখার বাঁশের ডালু বা ডালা, বাজারে জিনিস নিয়ে যাওয়ার ঝুড়ি বা ডোকো। শস্য পিষবার পাথরের জাঁতা। শস্য গুড়ো করবার কাঠের সামগাইন বা ওখলি ও মুসলি। সবই প্রকৃতির ঘরে মজুত জিনিস, মানুষ তার নিজস্ব নানা প্রয়োজনে ব্যবহার করছে, পরিবেশ দূষণের কোনও সম্ভাবনা নেই। স্থানীয় নানা রকম খাদ্য সম্পর্কেও জানলাম। ভুট্টাদানা থেকে হয় মেজ রাইস। ময়দা, নুডলস,চিকেন ও সব্জি মিলিয়ে গেতুক। মেজ, গুড় আর ঘি দিয়ে তৈরি হয় চম্পা, মিষ্টি খাবার। এদিককার জঙ্গলে একধরনের গাছ আছে, যা থেকে নাকি ক্যানসারের ওষুধ তৈরি হয়। সে গাছের বোটানিক্যাল নাম ‘টেক্সাস বোকাটা’।
জানলাম লামা বা মঙ্করা বিয়ে-শাদি দেন। বিয়েতে ওনাদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়, শঙ্খ বাজানো হয়। পণ নেই বিয়েতে। মেয়েকে অনেক সময় জমি দেওয়া হয়। অবৈধ প্রণয় বা স্ত্রীকে ত্যাগ করলে নারীসমাজ শাস্তি দেয়। মেয়ের আদর বেশি, মেয়ে জন্মালে সকলেই খুশি হয়। বাচ্চার নামকরণের ক্ষেত্রে বেটির তিনদিনে আর বেটার সাত দিনে নামকরণ হয়। এসব বিষয়গুলোই জানছিলাম সাংগে দাজু আর দাওয়া দাজুর কাছ থেকে। সাংগে দাজু নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল এবং খুব শ্রদ্ধাশীল।
রাত বাড়ে কিন্তু গল্প কি আর শেষ হয়। একটি জাতির কত ইতিহাস, জীবনচর্চার রীতি নিয়ম, লোককথা, বিশ্বাস আরও কত কি থাকে, সামান্য আলাপচারিতায় তার কতটাইবা জানা যায়? কাল ভোরে উঠে তৈরি হয়ে বেরোতে হবে, এই ওখরে সাতমাইল থেকে হিলে অব্দি দাওয়া দাদা তাঁর মারুতিতে আমাদের পৌঁছে দেবেন, হিলে থেকে ভার্সে ট্রেক করে যাব আমরা। ভাবতেই মন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠছে। সেখানেই রাতের আড্ডার সমাপ্তি টেনে ঘরে এসে লেপমুড়ি দিই।
পরদিন ঘুম ভাঙল অজস্র পাখির কলতানে। কতরকমের যে ডাক, সত্যি ঘরে বসে থাকা দুষ্কর! ঠান্ডা বেশ ভালই পরেছে। তবে গরমজলের অভাব নেই ম্যাগনোলিয়ায়। চা আর খাবজে খেতে খেতে দূরের দিকে সারি সারি ঢেউ খেলানো পাহাড়ের দিকে চেয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকি! কিন্তু ঠিক আটটায় আসবে দাওয়া দাজুর গাড়ি। চটপট তৈরি হতেই সকালের ব্রেকফাস্ট হাজির, চমৎকার চিনে মাটির বাটিতে সবজি দেওয়া গরম গরম খিচুড়ি; অতি সুস্বাদু! ছিরিং জানালেন সবই তাদের নিজেদের খেতেরই ফসল। শুধু জৈবসারেই চাষ আবাদ হয়। ভাবি তাই এত স্বাদ! ঠিক আটটায় রওনা হলাম, মা চললেন আমাদের সঙ্গে। হিলে পর্যন্ত যাচ্ছেন বিদায় জানাতে, ফিরে এসে এঁদের সঙ্গেই থাকবেন ম্যাগনোলিয়ায়। সে দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিয়েছেন ছিরিং লামু আর সাংগে দাদা।
ওখরে থেকে হিলের দূরত্ব দশ কিমি। সবটা পথ জুড়ে গুরাসের সাদা, গোলাপী, লাল পাপড়ি বিছিয়ে আছে। কি অপূর্ব একটা রঙিন সকাল, বাতাস কেমন বিশুদ্ধ,আহা অপূর্ব! পথ ক্রমাগত ওপরে উঠছে দেখতে পাই অদূরেই ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো পাহাড়ের বিস্তার। আর দুধারেই জটাজূটধারি শতবর্ষীয় সাধুর মতো, গায়ে শ্যাওলার আস্তরণ জড়ানো বহু প্রাচীন বিশাল বিশাল বৃক্ষ! আর চোখে পড়ল স্কুল ইউনিফর্মে পায়ে হেঁটে কত ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে যাচ্ছে। দাওয়া দাদা বলেন অনেক ছেলেমেয়েই কয়েক কিমি পথ হেঁটে স্কুলে আসে। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে উঠুক বাচ্চারা।
পৌঁছে গেলাম হিলে। এখান থেকেই ট্রেক শুরু হবে ভার্সের উদ্দেশ্যে। আমাদের পারমিট নেওয়া আছে। হিমালয়ের সিঙ্গালিলা রেঞ্জে ১০,০০০ ফিট উচ্চতায় ভার্সে রডোড্রেনডন স্যাংচুয়ারি। হিলে থেকে ভার্সের দূরত্ব ৪.৫ কিমি, পৌঁছতে সময় লাগে ২/৩ ঘন্টা। আমাদের প্রায় আড়াইঘন্টা লেগেছিল। এখানে ছত্রিশ (৩৬) রকমের গুরাস দেখতে পাওয়া যায়। গোটা সিকিমে পাখি আছে প্রায় ৬৫০ প্রজাতির। খুঁজতে হলনা বা আমরা ডাকিওনি কিন্তু ফুরবা আর ফিপ্রাস নামের দুই তরুণ আমাদের পোর্টার কাম গাইড হবার জন্যে এগিয়ে এল। জানলাম তারা ছাত্র কিন্তু মাঝে মাঝে গাইডের কাজ করে, কিছু উপার্জন হয়। তাদের বাড়িও সাপ্রে নাগিতে। কি যে অদ্ভুত রোমাঞ্চক অনুভূতি হল পথে যেতে যেতে, সত্যি এ যেন রূপকথার কোনও রাজ্যে প্রবেশ করেছি। পাথুরে, সরু এবড়োখেবড়ো পথ, কোথাও খানিকটা উঠেছে কোথাও খানিক নামতে হবে। দুধারেই অজস্র গাছ, গাছের ছায়ায় ছায়ায় পুরো পথটাই কেমন রহস্যময় আর শীতল। ২৫০সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয় এখানে। পাহাড়ের ওপর থেকে কোথাও ঝোরার জল নেমে এসে পথের ওপর পড়ে থাকা পাতার স্তূপ ভিজিয়ে দিয়ে ডানধারের খাদের দিকে নেমে যাচ্ছে। কোথাও দুধারের সরু সরু বাঁশের বন ঝুকে আছে পাথুরে পথের ওপর। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির ওড়াওড়ি পথের ধারের ঝোপঝাড়ে। ভাঙ্গা স্বরে একটা –দুটো কাকের ডাক শুনতে পাই। ফার্ণ, মস,গুরাস, বাঁশবন, বড়-ছোট কত গাছের ঘনিষ্ট সহাবস্থান। কি বিপুল নিস্তব্ধতা! অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হল স্থান মাহাত্মেই হয়তবা… বহুদূর থেকে যেন ভেসে আসছে কোনও গুম্ফার প্রার্থনা মন্ত্রধ্বনি! গাইড তরুণ বলে ভ্রমরের গুনগুন। তাই নাকি? রাস্তার ধারে কোথাও কোথাও দেখছি যেন কেউ মাটি খুঁড়ে রেখেছে! গাছের দেহকান্ডেও আঁচড়ের দাগ। ফুরবা জানায় বুনোশূওর আসে,মাটি খুঁড়ে গাছের মূল-কন্দ খায়। গা শিরশির করে, যদি পাহাড় বেয়ে নেমে এসে বহিরাগতদের দেখে আক্রমণ করে বসে? গাইডদ্বয় জানায় ‘না, ভয় নেই। কিছু হবেনা’। বেশ, কিছু না হলেই মঙ্গল! পথের ধারে ওপরে শেড দেওয়া বেঞ্চ পাতা আছে গোটা চারেক, ক্লান্ত ট্যুরিস্টদের জন্যে। চকলেট আর শুকনো ফল দুএকবার মুখে দিলাম। ক্রমে বাঁশবন কমে এসে শ্যাওলা জড়ানো বিশাল বৃক্ষ দুধারে; তাদের মধ্যে কতগুলো তো বেশ বয়স্ক মানে পুরনো। যেন কতযুগ ধরে তারা ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে, গায়ে তার যুগান্তরের চিহ্ন!
আমরা সরু পাথুরে পথ বেয়ে নেমে যাচ্ছি ফুরপার সঙ্গে, দুধারের গুরাসের গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল আশ্রম বালিকার মতো পবিত্র সোন্দর্য নিয়ে যেন আমাদের নীরব ভাষায় বলছে, সুস্বাগতম! খানিকবাদে ভারি সুন্দর কাচ আর কাঠের ‘গুরাস কুঞ্জ’ আর তার অল্প নীচেই আমাদের থাকবার জায়গা ‘ফরেস্ট ব্যারাক’। তরুণ দুই গাইড দেখলাম একমুখ হাসি ছড়িয়ে ব্যাকপ্যাক দুটো ঘরে রেখে ওধারের কিচেনে ঢুকে পড়ল। যেদিকে তাকাই শুধুই রঙের বিস্তার। গুরাস যে কত শেডের হতে পারে এখানে না এলে কোনও ধারণাই হতোনা। ১০৪ কিমি বিস্তার এই ‘ভার্সে রডোড্রেনডন স্যাঙ্কচুয়ারি’র। এত ফুল একই সঙ্গে পৃথিবীর আর কোথাও ফোটে?
তাহলে সত্যি ভার্সেতে এলাম! ভারত-নেপাল সীমান্তের প্রাকৃতিক সীমানা এই ১০৪ স্কোয়ার কিমি এলাকা জুড়ে এই গুরাসের বন, ভার্সে রডোড্রেনডন স্যাঙ্কচুয়ারি। অন্যান্য রঙিন ফুল আর বেশ বড় আকারের ম্যাগনোলিয়াও ফোটে এই ফুলের বনে। জীবনে এমন ফুলের বাহার আর দেখিনি বা এমন রূপসুধাও নয়ন ভরে আর কখনও পান করিনি। পাখি, প্রজাপতি, ভালুক, চিতা, লাজুক পান্ডা আরও নানা অরণ্য সম্পদ মজুদ রয়েছে এ বনে। ভাগ্যে থাকলে দেখা হবে। এরপর খাড়াই বেয়ে আরও ৫০০ফিট উপরে ‘ভার্সে টপে’ পৌছে যাই, এটাই এখানকার উচ্চতম চূড়া। বহু দূর দূর ফুলে ছাওয়া উপত্যকা নজরে আসে। হাওয়ার কেমন এক শব্দ যেন অন্য কোনও জগতের আভাস। ওপরে সবুজ ঘাসে ঢাকা সমতল ছোট চাতাল, তার একধারে পাথরে নির্মিত সাদা রঙ করা ছোট্ট একটা স্তূপ। লাল গুরাসের ফুলসুদ্ধ একটা ছোট ডাল ভেঙে সেই স্তূপের ওপর রাখি, প্রণাম করি, মনে মনে উচ্চারণ করি অন্তিম শয্যায় বুদ্ধের সেই বাণী ‘আত্মদীপ ভব, আত্মশরণ ভব, অনন্যো শরণ ভব’। – নিজেকে প্রদীপ করে তোলো, সেই আলোয় পথ খুঁজে নাও, অন্যের শরণ নিও না’।
লাঞ্চের টাইম হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ঘরের ভেতরে যেতে ইচ্ছে করেনা, বাইরের চেয়ারে বসে লাঞ্চ সারি; ডাল, পাপড় পোড়া, আলুকপির সবজি, স্যালাড। সুগন্ধি সরুচালের ভাত, চাল আসে পশ্চিম বাংলা থেকেই জানান দাজু। এখানে আলু আর সবজি চাষ হয়, ধানের চাষ খুব কম কিন্তু চামাল বা চাল সব্বাই খায় তবে খুব আনন্দের সঙ্গে বলেন, ‘এখানে জৈব সারে চাষ হয় তাই এখানকার আলুবীজের চাহিদা খুব’। বেলা পড়ে আসছে ঠান্ডার তীব্রতা বাড়ছে, টুপি-মাফলার জড়িয়েও কান আর চোয়ালঘেষা দাঁতগুলো ব্যাথা করছে। ঘরে ঢুকে পড়ি কিন্তু বাইরের আলো নিভতে নিভতে ৬:৩০। কিন্তু অন্ধকার হয়নি। বাহির দেখছি ঘরে তিষ্ঠোতে দিচ্ছেনা! নানাপ্রকারের শীতবস্ত্রে আপাদমস্তক মুড়ে আবার বেরোই। আশিস লেপ মুড়ে শুয়ে পড়ে। ট্রেকার্স হাট থেকে বেরিয়ে বাঁ ধারের সরু পাথুরে পথ ধরে চলতে থাকি, নেমে পড়ি গুরাসের বনে। দূরে কাছে কত শত ফুলেভরা গুরাসের গাছ! অদূরে গুরাস টপ। পায়ের নীচে নরম ঘাসে আচ্ছাদিত ভূমি, দামী কার্পেট যেন! কি গভীর নৈশব্দ, কেমন শান্ত সব। আত্মার আরাম যেন! ফিরে আসি ধীরে ধীরে, ওদের কিচেনে ঢুকি অনুমতি নিয়ে, ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিল শরীর। উনুনের সামনে বসে আরাম হল। সুখ দুঃখের অনেক গল্প হোল, গোপাল দাজু এবং আরও ক’জন মিলে। দাজু বলেন, ফোন নম্বর, ব্যাংক এ সি নম্বর দিয়ে দিলে সহজেই বুকিং হয়ে যাবে, মাঝখান থেকে শহরের ব্রোকাররা পয়সা খাচ্ছে। খাটনি তো সব আমাদের’।
হু হু করে হাওয়া বইছে। ঠান্ডা তীব্র। ভালো জ্যাকেট আর পায়ের জন্যে লম্বা বুটজুতো দরকার এখানে। একমগ কফি আর পাপড়ভাজা দিলেন ওনারা। ঘরে মোমের আলো, বাইরেটা ফগে ভরে গেছে। আকাশে তারা নেই। সামান্য ওপরের ‘গুরাস কুঞ্জ’ জেনারেটরের আলোয় ঝলমল করছে। খানিকবাদেই বজ্র গর্জন, ঘন ঘন বিদ্যুতের চমক, তারপরেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হোল। গোপাল দাজু বলেন, ‘কাল আচ্ছি তারা কাঞ্চনজঙ্ঘা নজর মে আয়গা’। কাল আকাশ পরিস্কার থাকবে, ঝকঝকে দিনে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলবে। দেখা যাক। রাতের ডিনারে চিকেন আর রুটি। জল এমন ঠান্ডা মনে হচ্ছে হাত কেটে যাবে, বাথরুম যাওয়া খুব কষ্টকর।
পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভাঙল ভোরে। কালরাতের প্রবল বৃষ্টির পর চারদিক ভেজা ভেজা কিন্তু সূর্যদেব উদিত হয়েছেন, সকালের রোদের ছোঁয়ায় চারদিক পবিত্র, সুন্দর। ব্যারাকের সামনের উঁচু জায়গায় অনেকেই ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে, তার দর্শনের আশায়। কিন্তু তার মুখের ওপর ঘিয়ে আর সাদা মেঘের ওড়না। তারপর একটু একটু করে ওড়না সরছে আর বরফ মোড়া অন্নপূর্ণারেঞ্জের ও অন্যান্য শৃঙ্গগুলি দেখতে পাচ্ছি; সবার ওপর সমুন্নত মহিমায় বিরাজ করছেন তিনি, কাঞ্চনজঙ্ঘা। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই। চা-পান করে আবার বেরিয়ে পড়ি। আজ দক্ষিন দিকে অনেকটা হেঁটে আসি সেই স্বপ্নময় গুরাস বাগানের ভেতর দিয়ে। ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট খেলাম লুচি, আলুর তরকারি, মিক্সড আচার, বড় এক মগ চা।
ভার্সে ছেড়ে ফেরার পথ ধরি, মন বলে আবার আসব কিন্তু শরীর কতটা সহযোগিতা করবে জানিনা। আহা! ভার্সে ভালো থেকো হে পরমা সুন্দরী, হে রূপকথার রাণী! ফেরার পথেও গাইড হিসেবে চলল মিংমা আর সামতেং শেরপা। গল্পে গল্পে পথ ভাঙি আমরা।
হিলেতে দাওয়া দাজু আমাদের অপেক্ষায়, তরুণ গাইডদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা ম্যাগনোলিয়া হোমস্টে। শিরিংয়ের হাতের রান্না আর সযত্ন পরিবেশনে দুপুরের লাঞ্চ সারা হল; আলুভাজা, ডাল, পাপড়, সব্জিস্যুপ, ব্রকোলি-আলুর তরকারি। রোদে ভেসে যাচ্ছে উঠোন, এ জায়গাও ৭,৬০০ফিট উচ্চতায় কিন্তু ভার্সের ওই ঠান্ডার পর এখানে আর তেমন শীত করছে কই? এবার বিদায়মুহূর্ত, মনে হোল নিজের বাড়ি ছেড়েই যেন চলে যাচ্ছি! দাওয়া দাজুর গাড়িতে উঠে বসলাম মালপত্র নিয়ে। গাড়ি ছাড়ল, যতদূর দৃষ্টি চলে তাকিয়ে রইলাম ওই রোদভরা উঠোন, সাংগে দাজু, মিষ্টি মেয়ে ছিরিংয়ের দিকেই। বাঁক ফিরতেই হারিয়ে গেল ওরা, কিন্তু মনের উঠোনে চিরকালীন রোদ্দুর হয়ে জেগে রইল। তাহলে বিদায় !
দাওয়া দাজু পৌঁছে দিলেন সোমবারি পর্যন্ত। সেখান থেকে শেয়ার জীপে জোরথাং, তারপর রঙ্গিতকে বাঁয়ে রেখে শেয়ার জীপে ৪০/ টাকা ভাড়ায় নামচি। আজ আর কাল দুদিন নামচির কাছাকাছি সব দর্শনীয় স্পট বেড়িয়ে, পরশু আমরা ফিরব আপন কুলায়।
তনুশ্রী পাল।
====================================================================================================

( আমরা গিয়েছিলাম ২০১৩র এপ্রিলে। সে সময়কার ভাড়া এবং অন্যান্য বিষয় উল্লিখিত হয়েছে। এন জে পি এবং বাগডোগরা থেকে গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। পশ্চিম সিকিমের ওখরে, সাপ্রে নাগির ম্যাগনোলিয়া হোমস্টের সাংগে দাজুর সঙ্গে যোগাযোগের ঠিকানাঃ Magnolia village Homestay. 7th mile, Okhrey. Cont. 9609856414, 7679398276 )
এই পৃষ্ঠাটি লাইক এবং শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন

2 thoughts on “পশ্চিম সিকিমে, ঈশ্বরের নিজস্ব বাগানে

  1. দীর্ঘ এই লকডাউন,ঘর বন্দি, ভালো লাগছে না,আর এর মধ্যে আপনার এই লেখাটি যেন তৄষ্না নিবারণ ঘটাল,আপনার সাথে সাথে যেন আমার ও মানস ভ্রমন হয়ে গেল,খুব সুন্দর লাগল পড়ে, পরবর্তী লেখার (প্লিজ কোন ভ্রমন বিষয়ে)অপেক্ষায় রইলুম

  2. অজস্র ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার পাঠপ্রতিক্রিয়া পেয়ে প্রাণিত হলাম। ভালো থাকবেন। অবশ্যই জানাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *