স্বল্পচেনা ডাউকি
সুমেধা চট্টোপাধ্যায়
শীতকালে কাজিরাঙা যাওয়ার পথে যখন ঠিক করেছিলাম যে মেঘালয় যাব, তখন মনের মধ্যে একটা উইশলিস্ট তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই তালিকার একেবারে উপরের দিকে জায়গা করে নিয়েছিল বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মেঘালয়ের একটি ছোট্ট জনপদ— ডাউকি। নামটা শুনতে যতটা সাদামাটা, বাস্তবে জায়গাটা ততটাই মায়াবী। এই জনপদ যতটা না সীমান্তবর্তী এলাকা হিসেবে পরিচিত, তার চেয়ে ঢের বেশি জনপ্রিয় এখানকার উমঙ্গট নদীর অবিশ্বাস্য স্বচ্ছ এবং সুন্দর রূপের জন্য। ইন্টারনেটে বহুবার এই নদীর ছবি দেখেছি— নীল-সবুজ জলের উপর যেন শূন্যে ভাসমান একটা কাঠের নৌকা, নিচে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটা নুড়িপাথর স্পষ্ট। মনে হত এসব বুঝি ফটোশপের কারসাজি। কিন্তু নিজের চোখে দেখার পর বুঝেছিলাম, প্রকৃতি মাঝেমধ্যে এমন সব দৃশ্য তৈরি করে যা কোনো সম্পাদনা সফটওয়্যারের কল্পনাশক্তিকেও হার মানায়।
রৌদ্রকজ্জ্বল দিনে, বৃষ্টিহীন আবহাওয়ায় উমঙ্গট নদীর তলদেশ একদম পরিষ্কার দেখা যায়, আর এখানে যে নৌকাবিহার হয়, সেগুলো উপর থেকে বা পাশ থেকে দেখলে মনে হয় যেন নৌকাটি নদীতে নয়, হাওয়ায় ভাসছে। এই দৃশ্যটুকু নিজের চোখে দেখব বলেই আমাদের শীতকালীন ভ্রমণসূচিতে প্রথম রাত্রিবাস রাখা হয়েছিল ডাউকিতে, যাতে পরদিন সকাল সকাল উঠে উমঙ্গটে নৌকাবিহার সেরে ফেলা যায়। কারণ, শুনেছিলাম, বেলা বাড়লে পর্যটকের ভিড়ে আর রোদের তীব্রতায় সেই স্বপ্নিল আবহ কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে আসে।
ভ্রমণের আগে বহুবার মনে হয়েছে, এত ঘুরেছি দেশের নানা প্রান্তে, নদী তো অনেক দেখেছি— গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা— তাহলে একটা ছোট্ট পাহাড়ি নদী দেখার জন্য এত আয়োজন কেন? কিন্তু যাঁরা উমঙ্গটের ছবি একবার দেখেছেন, তাঁরাই জানেন এই কৌতূহলের উৎস কোথায়। প্রতিটি ছবিতেই এমন একটা স্বচ্ছতা ধরা পড়ে, যা সচরাচর দেখা যায় না। মনের মধ্যে তাই একটা জেদ কাজ করছিল— নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত শান্তি নেই। সেই জেদ থেকেই মেঘালয়ের ভ্রমণসূচি ঢেলে সাজিয়ে ডাউকিকে প্রথম দিনের গন্তব্য করে নেওয়া হল।
আমরা শিলং-এ পৌঁছে প্রথমে ক্রাং সুরি জলপ্রপাত এবং একটি ছোট রুট ব্রিজ ঘুরে দেখে তারপর ডাউকির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। শিলং শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে যতই এগোতে থাকলাম, রাস্তার দুধারের দৃশ্যপট ততই বদলে যেতে লাগল। ঘন সবুজ পাহাড়, তার মাঝে ছোট ছোট খাসি গ্রাম, আর মাঝেমধ্যে টিনের চালের বাড়ির উপর দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘের স্তর— এক কথায় অপার্থিব। রাস্তা বেশ বন্ধুর, পাহাড়ি রাস্তার চিরাচরিত বাঁক আর খানাখন্দ পেরিয়ে এগোতে হচ্ছিল। আলো কমে আসায় বেশ একটু সমস্যায়ও পড়তে হয়েছিল, কারণ পাহাড়ি রাস্তায় সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমানতা কমে যায় খুব দ্রুত, আর বাঁকগুলোও তখন আরও বেশি বিপজ্জনক মনে হয়।
শিলং থেকে মেঘালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, প্রায় বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি ডাউকির অবস্থান। পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে বাঁকে যেন মেঘ এসে গাড়ির জানলায় উঁকি দিচ্ছে— কখনো কখনো এতটাই ঘন কুয়াশা বা মেঘ নেমে আসছিল যে সামনের রাস্তা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল কিছুক্ষণের জন্য। গাড়ির কাচ নামিয়ে দিলে ঠান্ডা, ভেজা হাওয়া সোজা মুখে এসে লাগছিল, আর সেই হাওয়ায় মিশে থাকা পাহাড়ি গাছপালার একটা টাটকা গন্ধ পুরো যাত্রাটাকে অন্যরকম করে তুলেছিল। মাঝেমধ্যে রাস্তার পাশে ছোট ছোট জলপ্রপাতও চোখে পড়ছিল, বর্ষার রেশ তখনও যেন খানিকটা লেগে ছিল পাহাড়ের গায়ে।
শিলং থেকে ডাউকি প্রায় ৮০ কিলোমিটার রাস্তা। এমনিতে ঘণ্টা তিনেক সময় লাগার কথা, কিন্তু আমরা যেহেতু পথের সৌন্দর্য একটু একটু করে উপভোগ করতে করতে যাচ্ছিলাম, মাঝেমধ্যে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলছিলাম, তাই স্বাভাবিকভাবেই একটু দেরি হয়ে গেল। রাস্তার দুপাশে মাঝেমধ্যেই ছোট ছোট বাজার চোখে পড়ছিল, যেখানে স্থানীয় মানুষরা পাহাড়ে ফলানো নানারকম ফল আর সবজি নিয়ে বসে থাকেন। কমলালেবুর মরসুম ছিল বলে রাস্তার ধারে ছোট ছোট স্তূপ করে রাখা কমলালেবু দেখতে বেশ ভালো লাগছিল। তবে রাস্তা যেহেতু খুব একটা ভালো নয়, তাই সন্ধ্যার আগেই ডাউকি পৌঁছে যাওয়া বাঞ্ছনীয়— নাহলে অন্ধকারে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানো এবং গন্তব্য খুঁজে বের করা, দুটোই বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের ক্ষেত্রেও শেষ কিছুটা পথ প্রায় আলো-আঁধারিতেই পেরোতে হয়েছিল, আর সেই সময়টুকুতে মনের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল— এই বুঝি ডাউকি এসে গেল।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি— এই সময়টাই ডাউকি ভ্রমণের জন্য আদর্শ, কারণ তখন নদীর জল সবচেয়ে স্বচ্ছ থাকে এবং আবহাওয়াও মনোরম, ঠান্ডা কিন্তু কনকনে নয়। বর্ষাকালে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) পাহাড় থেকে নেমে আসা পলিমাটির কারণে নদীর জল ঘোলা হয়ে যায়, তাই সেই সময়টা এড়িয়ে চলাই ভালো— কারণ উমঙ্গটের আসল আকর্ষণই তো তার স্বচ্ছতা, সেটা না থাকলে জায়গাটার আবেদন অনেকটাই কমে যায়। ঠিক এই কারণেই আমি ডাউকি দেখার সময়কাল হিসেবে শীতকালকেই বেছে নিয়েছিলাম। যদিও পাহাড়ি জায়গায় বৃষ্টি যখন-তখন আসতে পারে, ঋতুর কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। তাই শীতকালেও ঘোলা জল দেখার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। সৌভাগ্যবশত আমাদের ভাগ্যে এই দুর্ভাগ্য জোটেনি— যেদিন আমরা পৌঁছেছিলাম, আকাশ ছিল একদম পরিষ্কার, নীল, এক টুকরো মেঘও ছিল না।
ডাউকিতে আমরা লামিন গেস্ট হাউসে রাত্রিযাপন করেছিলাম। গেস্ট হাউস খুঁজে বের করা এবং বুকিং, দুটোই আমার নিজের করা ছিল, তাই একটু চিন্তাও ছিল মনে মনে— জায়গাটা কেমন হবে, ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, এসব ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু পৌঁছে দেখলাম, আপ্যায়ন সত্যিই খুব ভালো। ঘরগুলো আকারে ছোট হলেও অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং গোছানো, জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে পাহাড়ের একটা টুকরো দৃশ্য চোখে পড়ত। রাতের বেলা পাহাড়ি এলাকার চিরাচরিত নিস্তব্ধতা— দূরে কোথাও ঝিঁঝি পোকার ডাক, আর মাঝেমধ্যে হালকা হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছিল না। ভ্রমণক্লান্ত শরীরে সেই নিস্তব্ধতা এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিয়েছিল।
রাত কাটিয়ে পরদিন বেশ সকাল সকাল গেস্ট হাউসের ডাইনিং-এ আলুর পরোটা আর ডিমের পোচ খাওয়ার ডাক পড়ল। সঙ্গে জুস, চা, কফি ইত্যাদি— যার যেমন ইচ্ছা, সে তেমনটাই বেছে নিল। পাহাড়ি সকালের ঠান্ডা হাওয়ায় গরম গরম পরোটা আর চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে থাকার মধ্যে একটা আলাদা তৃপ্তি ছিল। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল, বাইরে তখন সবে সূর্যের প্রথম আলো এসে চারিদিককে সোনালি আভায় মুড়ে ফেলছে ধীরে ধীরে।
গেস্ট হাউসের ডাইনিং ঘরটা ছোট হলেও বেশ ছিমছাম, কাঠের চেয়ার-টেবিল আর দেওয়ালে খাসি সংস্কৃতির কিছু ছবি সাজানো ছিল। খাবার পরিবেশনের সময় গেস্ট হাউসের কর্মীরা হাসিমুখে সবার খোঁজখবর নিচ্ছিলেন, কারও কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করছিলেন। এই ধরনের ছোট ছোট আন্তরিকতাই একটা ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তোলে। খাওয়াদাওয়া সেরে যখন বেরোনোর তোড়জোড় চলছে, তখন বাইরে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘের একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে আছে, রোদ উঠতেই সেই মেঘ ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। এই দৃশ্যটুকু দেখেই মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা নদী দেখার জন্য একেবারে আদর্শ হতে চলেছে।
আমাদের ড্রাইভার দাদাকে আগে থেকেই বলা ছিল, আমরা একদম সকাল সকাল উমঙ্গট নদীতে বোটিং সেরে নেব। রোদ উঠেছে, আকাশ পরিষ্কার, ঝকঝকে আবহাওয়া দেখে মনটা ভরে গেল। ছবিতে যেমন দেখে এসেছি— সবুজ ঝকঝকে, স্বচ্ছ জলের উপর ভেসে থাকা নৌকা, জলে নয় বলে মনে হয় যেন নৌকা হাওয়ায় ভাসছে— ঠিক সেইরকম দৃশ্য একবার নিজের চোখে দেখব বলেই তো এই শীতকালে ডাউকিতে আসা।
গেস্ট হাউসের কর্ণধারের কাছ থেকে গল্প শুনছিলাম, ডাউকি থেকে কিছুটা দূরে স্নংপেডং নামের একটি গ্রাম নদীর ধারেই অবস্থিত, আর সেখানেই গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ক্যাম্পসাইট। তাঁবুতে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা সত্যিই ভোলার নয় বলে তিনি জানালেন। আমার অভিজ্ঞতা যদিও অনেক পরে হয়েছিল, তবু সেই বর্ণনা শুনেই মনের মধ্যে একটা ছবি তৈরি হয়ে গিয়েছিল— রাতে আকাশভরা তারা, নদীর মৃদু কলকল শব্দ, আর সকালে ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে। যারা রোমাঞ্চপ্রিয়, তাদের জন্য এখানে ক্লিফ জাম্পিং, কায়াকিং আর জিপ-লাইনিংয়ের ব্যবস্থাও আছে। শুনেছি স্নংপেডং-এর ক্যাম্পসাইট থেকে ভোরবেলা নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে সূর্যোদয় দেখার অভিজ্ঞতাও নাকি অসাধারণ।
নদীর ধারে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়ল সারি সারি রঙিন কাঠের নৌকা— লাল, নীল, হলুদ নানা রঙে সাজানো, যেন এক টুকরো রংধনু নেমে এসেছে নদীর তীরে। স্থানীয় মাঝিরা অত্যন্ত দক্ষ হাতে নৌকা বেয়ে নিয়ে যান নদীর বুকে, তাঁদের দাঁড় টানার ছন্দময় শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ কানে আসছিল না। জল এতটাই স্বচ্ছ যে নৌকা থেকে নিচের দিকে তাকালে মনে হয় হাওয়ায় ভাসছি— নদীর তলদেশের নুড়ি-পাথর, ছোট মাছের ঝাঁক, সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়, যেন কাচের একটা পাত্রের মধ্যে দিয়ে দেখছি। শীতের মাসগুলোয় (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) জল সবচেয়ে স্বচ্ছ থাকে, তখন এই নদী পৃথিবীর অন্যতম পরিষ্কার নদী হিসেবে পরিচিতি পায়— এই দাবিটা যে নিছক প্রচার নয়, তা নিজের চোখে দেখলেই বোঝা যায়।
নদীর একদিকে ভারত, অন্যদিকে বাংলাদেশ— দুই দেশের সীমান্ত এখানে এক অদ্ভুত নৈকট্যে মিশে আছে। কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই, নেই কোনো কড়া প্রহরার ছাপ— শুধু নদীর জলের একটা কাল্পনিক রেখাই যেন দুটো দেশকে আলাদা করে রেখেছে। দূরে বাংলাদেশের অল্প ঘর-বাড়ি দেখা যায় স্পষ্ট। এই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, ভূ-রাজনৈতিক সীমারেখা যতই কঠোর হোক না কেন, প্রকৃতি নিজের নিয়মে সব কিছুকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে।
গাড়ি থেকে যেখানে নামানো হল, সেখান থেকে উপর থেকে দেখলাম নিচে নদীতে অজস্র নৌকা ভাসছে, প্রতিটা নৌকার রং আর প্রতিফলন মিলেমিশে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেছে। পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার জন্য নৌকার মালিকেরা উপরেই বসে থাকেন, ডাকাডাকি করেন, দরদাম করেন। সেইরকম একজন মালিকের সঙ্গে কথা বলে, একটা নৌকা ঠিক করে নিচে নদীর দিকে যাওয়ার রাস্তা ধরলাম। রাস্তাটা বেশ খাড়া, সিঁড়ির মতো ধাপ কাটা, আর কিছুটা পিচ্ছিলও। আমি সেদিন কায়দা করে একটা লং ড্রেস পরে গিয়েছিলাম, ফলে সিঁড়ি ভেঙে নামতে বেশ অসুবিধাই হয়েছিল। কিন্তু নৌকার মালিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন, তাঁর অভিজ্ঞ হাতের ভরসায় নিরাপদেই নিচে নেমে এলাম। পথের ধারে বয়স্কদের জন্য সতর্কীকরণ লেখা একটা বোর্ডও চোখে পড়ল— বোঝাই যাচ্ছিল, খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নামাটা সকলের জন্য সহজ নয়।
নিচে পৌঁছে দেখি, সত্যিই নদীর জল এত স্বচ্ছ যে তলদেশে পড়ে থাকা প্রতিটা নুড়িপাথর আলাদা আলাদা করে দেখা যাচ্ছে। নৌকায় উঠে বসতেই মন ভরে গেল। মাঝি ধীরে ধীরে দাঁড় টেনে নৌকা নিয়ে চললেন নদীর বুক চিরে, আর আমরা দুই পাশে তাকিয়ে সেই অপার্থিব দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলাম। বাংলাদেশের মাটি ছুঁয়ে নৌকা আবার ফিরে আসে, কিন্তু সেখানে নামতে দেওয়া হয় না— সীমান্তরক্ষীদের কড়া নজরদারি না থাকলেও, একটা অলিখিত নিয়ম যেন সবাই মেনে চলেন। ঝকঝকে দিনে একদম মনের মতো ছবি পেলাম, প্রতিটা ফ্রেমেই যেন নদী আর আকাশ একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দিচ্ছিল।
নৌকায় বসে চারদিকে তাকাতে তাকাতে মনে হচ্ছিল, এ এক আশ্চর্য জায়গা, যেখানে দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে দুটো দেশের মাটি চোখের সামনে দেখা যায়, অথচ কোথাও কোনো উত্তেজনা নেই, নেই কোনো অস্বস্তি। নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ গাছপালা, তার প্রতিফলন জলে পড়ে আরও গাঢ় সবুজ হয়ে ফুটে উঠছিল। মাঝে মাঝে দুয়েকটা পাখি জলের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, আর তাদের ডানার ছায়া নদীর তলদেশ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, এতটাই স্বচ্ছ ছিল জল। মাঝি ধীর গতিতে দাঁড় টানছিলেন, যাতে যাত্রীরা প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করার পর্যাপ্ত সময় পান। মাঝেমধ্যেই তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে দেখাচ্ছিলেন, কোনদিকে বাংলাদেশ, কোনদিকে ভারত— যদিও চোখে দেখে বোঝার তেমন উপায় নেই, শুধু তাঁর কথাতেই সেই অদৃশ্য সীমারেখাটা মনে মনে আঁকতে হচ্ছিল।
এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। রোদ লাগছে বলে যদি ছায়ায় নৌকা নিয়ে গিয়ে ছবি তোলা হয়, তাহলে সেই বিখ্যাত ‘হাওয়ায় ভাসছে’ ব্যাপারটা ছবিতে ধরা পড়বে না। বস্তু এবং চিত্রগ্রাহক, দুজনকেই সরাসরি রোদে থাকতে হবে, তবেই জলের ভেতর দিয়ে আলো প্রতিফলিত হয়ে সেই স্বচ্ছতার আসল রূপ ফুটে ওঠে। আলো সরাসরি জলের উপর পড়লেই সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছতা দেখা যায়— এই ছোট্ট কৌশলটা জানা থাকলে ছবি তোলার অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হয়।
আমি এখানে আসার আগে ভাবতাম, ‘ডাউকি’ বোধহয় নদীটারই নাম। বেশিরভাগ মানুষই তাই জানেন, ইন্টারনেটেও অনেক জায়গায় এই ভুল তথ্যই ছড়িয়ে আছে। আদতে এটি জনপদটির নাম, নদীর প্রকৃত নাম উমঙ্গট, যে কিনা বাংলাদেশের মাটি ছুঁয়ে আমাদেরও স্পর্শ করে গেল। ছোট্ট এই ভুল ধারণাটা ভাঙা গেল স্বচক্ষে দেখার পরই।
ডাউকি থেকে ঘুরে নেওয়া যায় অপূর্ব ক্রাং সুরি জলপ্রপাত, লিভিং রুট ব্রিজ আর ছোট ছোট খাসি গ্রাম— প্রতিটা জায়গাই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য। ক্রাং সুরি জলপ্রপাতের নীলচে-সবুজ জল আর তার চারপাশের ঘন সবুজ অরণ্য এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয়, আর লিভিং রুট ব্রিজ দেখলে বোঝা যায়, খাসি জনজাতির মানুষরা কীভাবে বছরের পর বছর ধরে গাছের শিকড়কে নিজেদের প্রয়োজনে বেঁকিয়ে-চুরিয়ে তৈরি করেছেন এক একটা জীবন্ত সেতু। ছোট ছোট খাসি গ্রামগুলোতে ঘুরলে বোঝা যায় স্থানীয় মানুষের সরল জীবনযাপন, তাঁদের আতিথেয়তা আর প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।
নৌকাবিহার শেষ করে যখন আবার সেই খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছিলাম, তখন বারবার পিছন ফিরে তাকাচ্ছিলাম নদীর দিকে। মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্য চোখে যতটুকু ধরে রাখা যায়, ততটুকুই লাভ— কারণ ক্যামেরার ফ্রেমে যতই ভালো ছবি ওঠে না কেন, চোখের সামনে সরাসরি দেখা অভিজ্ঞতার ধারেকাছেও তা পৌঁছয় না। উপরে উঠে এসে গাড়িতে ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল, এত অল্প সময়ের মধ্যে এত সুন্দর একটা জায়গা দেখে ফেলা গেল, অথচ মনটা তখনও যেন নদীর ধারেই পড়ে রইল।
সব মিলিয়ে ডাউকি শুধুমাত্র একটা সীমান্তবর্তী জনপদ নয়, এটা একটা অভিজ্ঞতা— যেখানে প্রকৃতি নিজের সবচেয়ে স্বচ্ছ, সবচেয়ে সুন্দর রূপ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে। যাঁরা মেঘালয় ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ— ভ্রমণসূচিতে ডাউকিকে বাদ দেবেন না, আর যদি সম্ভব হয়, শীতের এক ঝকঝকে সকালেই উমঙ্গটের বুকে নৌকাবিহারের অভিজ্ঞতাটা নিন। সঙ্গে যদি হাতে একটু বাড়তি সময় থাকে, তাহলে স্নংপেডং-এর ক্যাম্পসাইটে অন্তত একটা রাত কাটিয়ে দেখতে পারেন— নদীর একেবারে কাছে থেকে রাত্রিযাপনের অভিজ্ঞতা এই জায়গার সৌন্দর্যকে আরও গভীরভাবে অনুভব করার সুযোগ করে দেবে। জীবনে এমন কিছু দৃশ্য থাকে, যা ছবিতে দেখা আর নিজের চোখে দেখার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক— উমঙ্গট নদী ঠিক তেমনই একটা দৃশ্য, যা বারবার দেখলেও পুরনো হয় না।

খুব সুন্দর লেখা। ভীষণ ভাল লাগল। চোখের সামনে ডাউকি দেখতে পেলাম।