bibidho-entuli-nidhon

এঁটুলি নিধন 
রম্যরচনা
চুমকি চট্টোপাধ্যায়

 

বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিল দেবাংশু। সামনের গোল বেতের টেবিলে এক কাপ দুধ চা রাখা। খুব গরম চা খেতে পারে না সে, তাই চা জুড়োবার অপেক্ষাতে এখনও কাপ মুখে তোলেনি।

একতলা বাড়ির এই বিশাল চওড়া বারান্দাটা দেবাংশুর ভারী পছন্দ। বলতে গেলে, বারান্দা দেখেই বাড়িটা কিনেছিল সে। তিন ঘরের বাড়ির ভেতরটা তেমন আহামরি নয়। রান্নাঘরটা বরং একটু একটেরে। সুবর্ণা বলেছিল, ‘অসুবিধে হবে না। তোমার যখন এত পছন্দ হয়েছে, তুমি নাও।’

বাড়িটা দোতলা। ওপরে বাড়ির মালিক পরিবার নিয়ে থাকেন। সমীরণ পালধি মানুষ ভালো। হঠাৎ করে অর্থ সঙ্কটে পড়ে বাড়ির একতলাটা বিক্রি করার বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন খবরের কাগজে। সেটা দেখেই দেবাংশু যোগাযোগ করেছিল সমীরণবাবুর সঙ্গে। কনট্র‍্যাক্ট পেপারে লেখা আছে, একতলার মালিক ছাদ ব্যবহার করতে পারবেন।

একতলা বাড়ি সাধারণত আজকাল কেউ কেনে না। বর্ষাকালে রাস্তায় জল জমলে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া মশা মাছি পোকা মাকড়ের উপদ্রব একটু বেশি থাকে। যেহেতু সুবর্ণার হাঁটুতে সমস্যা আছে তাই সিঁড়ি যত কম ভাঙা যায় ততই ভালো, বলেছিলেন ডাক্তারবাবু। আর তাই দেবাংশুর এই সিদ্ধান্ত।

পোকা মাকড়ের তেমন উৎপাত না থাকলেও এক চার হাতপেয়ের উৎপাত যথেষ্ট আছে। তিনি হলেন দেবাংশুর প্রতিবেশী সুনীতি আশ। এমন গায়ে পড়া এঁটুলি মানুষ এ অবধি দেখেনি দেবাংশু।

বাড়ি কেনার পর সবে সবে যখন এসেছে এ পাড়ায় তখন সমীরণবাবুরও আগে দেখা করতে চলে এসেছিল সুনীতি আশ।

‘নমস্কার। আমাদের মহল্লায় আপনাকে স্বাগত। আমি সুনীতি আশ। আপনার বাড়ির ঠিক সাড়ে চারখানা বাড়ি পরে থাকি।’

‘নমস্কার।’ প্রতিসৌজন্য দেখিয়ে ওই সাড়ে চারখানা শুনে সুনীতিবাবুর মুখের দিকে তাকিয়েছিল দেবাংশু। কিন্তু জিগ্যেস করেনি ‘সাড়ে টা কী বস্তু!’

‘হে হে হে হে… বুঝলেন না তো! বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই বাড়ির পরে চারখানা বাড়ি, তারপর একটা ইস্তিরিওলা বসে। এই পাড়ায় যত বাড়ি, সবার জামাকাপড় সেই বাপীই ইস্তিরি করে। তো, সেইটেকেই আমি ‘সাড়ে’ বলে উল্লেখ করেছি। আমার আবার একটু রসিকতা করতে ভালো লাগে, বুঝলেন কিনা।’

‘তাতে আর অসুবিধে কি! ভালো তো। আজকাল হাসি-মস্করা করতেই মানুষ ভুলে যাচ্ছে। রোজকার জীবনে কত রকম চাপ।’

‘অ্যাইত্তো, আপনি এক্কেবারে ঠিক বলেছেন। আপনার রসিকতা বোঝার ক্ষমতা আছে। ৯০ শতাংশ মানুষই বোঝে না জানেন তো! ভারী অদ্ভুত! আমি মজা করি বলে পেছনে আমার নিন্দে করে। আমি বেশ বুঝতে পারি। তা, আপনি কি একা? বৌমা বাচ্চারা কোথায়? না, মানে নতুন এসেছেন, আপনাদের সঙ্গে আলাপ করে খোঁজখবর নেওয়াটা আমার কর্তব্য, তাই নয় কি?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সেতো নিশ্চয়ই। আমার স্ত্রী সুবর্ণা গোছগাছ করছে আর আমার এক ছেলে দিব্যজ্যোতি, সে দার্জিলিঙে বোর্ডিঙে থেকে পড়াশোনা করে।’

‘ও আচ্ছা, আচ্ছা। কোন ক্লাসে পড়ে দিব্যজ্যোতি? কত বড় আর হবে, আপনার বয়স তো খুব বেশি নয়, এই ৪৬-৪৭ হবে মনে হয়। কী, ঠিক বললাম?’

‘৪৫।’

‘তব্বে, কাছাকাছিই গেছি কী বলেন? তা ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে?’

‘ক্লাস নাইন।’

‘বাবা, এতটুকু বয়েসে বোর্ডিঙে দিয়ে দিয়েছেন? এই বয়েসে বাবা মায়ের স্নেহ খুব দরকার হয় যে!’

‘ছেলের ইচ্ছেকে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। আমার খুড়তুতো ভাইয়ের ছেলে পড়ে ওখানে। ওর কাছে শুনে শুনে দিব্যরও খুব ইচ্ছে হয়েছিল দার্জিলিঙের কনভেন্টে পড়ে। সুযোগ পেয়ে গেল, তাই…।’

‘ও আচ্ছা আচ্ছা। তা ভালো।’ ইতিমধ্যে সেখানে এসে দাঁড়ায় সুবর্ণা। দেবাংশু আলাপ করিয়ে দেয়, ‘ইনি হলেন সুনীতিবাবু, আমাদের প্রতিবেশী। আমরা নতুন তাই আলাপ করতে এসেছেন।’

‘নমস্কার দাদা। চা খাবেন?’

‘অবশ্যই খাব। বৌমার হাতের চা কি না করা যায়? দুধ চিনি দিয়ে জম্পেশ করে বানাও দেখি। সরি সরি, তুমি বলে ফেললাম। অনেক ছোট কিনা, তাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।’

‘ঠিকই করেছেন দাদা। তুমি করেই বলবেন।’

দেবাংশুর পাশের চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে সুবর্ণার দেওয়া চায়ে চুমুক দিয়ে সুনীতিবাবু বললেন, ‘আহ! চা চমৎকার হয়েছে, বৌমা। আমার গিন্নি এই দুধ চাটা ভালো বানাতে পারে না, লিকারটা ঠিকঠাক করে। ভাবছি রোজ এসে বৌমার হাতের এক কাপ চা খেয়ে যাব।’

সুবর্ণা ‘হ্যাঁ, দাদা’ বলার আগেই দেবাংশু বলে ওঠে, ‘রোজ আর ওকে পাচ্ছেন কোথায় দাদা, ও তো স্কুলে পড়ায়, আজ রবিবার তাই বাড়ি আছে।’

‘ও হো হো হো, বাহ বাহ!  খুব ভালো। তা বেশ তো, ছুটির দিনগুলোতেই আসব নাহয়। দেবাংশুর সঙ্গে গল্পও হবে আবার বৌমার হাতের খাসা চা-ও খাওয়া হবে।’

সুনীতিবাবুর কথা শুনে দেবাংশুর একটু অস্বস্তি লাগলেও তার মনে হল, বয়স্ক মানুষ এসব বলছেন বটে তবে প্রতি ছুটির দিনেই আসবেন বলে মনে হয় না।

সুনীতিবাবু এসেছেন প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট হল, দেবাংশু বাজারে যাবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ দাদা, আমাকে একটু বাজারে যেতে হবে।’

‘ আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, যাও ভাই। আমিও উঠি। বাজারে কানাই মাছওলার থেকে মাছ নিও, টাটকা মাছ বেচে ছোঁড়া। আর পবন বলে একজন আছে, সবজি বিক্রি করে। একেবারে সতেজ সবজি, ওর থেকে নিও। ভালো জিনিস পাবে।’

‘ধন্যবাদ, দাদা। আমি এগোই তাহলে।’

‘আমিও যাই এখন। চললাম বৌমা, আজ আলাপ করে গেলাম, পরে এসে গল্পগুজব করব।’

সন্ধের মুখে দেখা করতে এলেন সমীরণবাবু। যত না বয়েস, শরীরের বয়েস তার চেয়ে বেশি দেখাচ্ছে। সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটেন। ওঁর স্ত্রী সেরিব্রাল স্ট্রোকে বহুদিন যাবত শয্যাশায়ী। খরচ টানতেই এক তলা বিক্রি করেছেন ভদ্রলোক।

‘সব ঠিক আছে তো, দেবাংশুবাবু? কোনো অসুবিধে হলে বলবেন।’

‘আমাকে নাম ধরে ডাকবেন দাদা।’ দেবাংশু বলে। ‘সব ঠিক আছে। আজ সুনীতিবাবু এসেছিলেন। খোঁজখবর নিলেন, দিলেনও কিছু। ভদ্রলোক বেশ আলাপী।’

‘এই সব্বোনাশ করেছে! এর মধ্যেই চলে এসেছে? দেখুন ভাই, অতিরিক্ত আলাপের চোটে পাগল হয়ে যাবেন। প্রায় রোজই হানা দেবে আর আপনাদের সময়ের বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দেবে। পাড়ার প্রত্যেকে ওঁকে এড়িয়ে চলে। দাদা হিসেবে আপনাকে সতর্ক করে দেওয়া আমার কর্তব্য, তাই বলে দিলাম।’

‘ও বাবা, তাই নাকি? হুম, একটু বেশি কথা বলেন ঠিকই কিন্তু সমীরণদা, বয়স্ক মানুষ তায় প্রতিবেশী, মুখের ওপর বলি কী করে বলুন তো?’

‘সেটা আপনিই ঠিক করুন কীভাবে হ্যান্ডল করবেন। প্রথম প্রথম আমি একেবারে তিতিবিরক্ত হয়ে গেছিলাম। এই বাড়ির পেছনে একটা ঘোরানো সিঁড়ি আছে। কখনো পেছনদিকে গিয়ে দেখবেন। এক দিন জানলা দিয়ে দেখি উনি আসছেন। সেদিন আবার আমার মেয়ে এসেছে, বাড়িতে আলুর চপ, বেগুনী বানানো হয়েছে।

‘আমি ডেসপারেটলি সামনের দরজায় তালা মেরে টক করে নেমে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকে বসে থাকলাম। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওঁর দৃষ্টি থেকে পিছলে গেছি। দিব্য বুঝলাম দরজার বাইরে উনি এসেছেন। আমরা সবাই নিশ্বাস বন্ধ করে ওনার যাবার অপেক্ষায় রইলাম। প্রায় মিনিট দশেক পর পর্দা সামান্য ফাঁক করে দেখলাম, ভদ্রলোক চলে যাচ্ছেন। খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। মানুষের নিজস্ব স্পেসও তো লাগে, বলুন না।’

‘সে তো একশোবার। চিন্তায় পড়ে গেলাম, সমীরণদা।’

‘বুদ্ধি খাটিয়ে উপায় ভেবে রাখুন। দু’ তিন চার দিন জুলুম সহ্য করার পর যেন আর না আসেন, সে ব্যবস্থা করুন। আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে বলবেন।’

সমীরণ পালধি চলে যাবার পর দেবাংশু ভাবতে বসে সুনীতি আশের হাত থেকে কীভাবে নিস্তার পাওয়া যায়। ভাবনার মাঝেই মনে পড়ে, আজ আই পি এল – এর কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ আছে। আর পনেরো মিনিটের মধ্যেই শুরু হবে। তাড়াতাড়ি টিভি খোলে দেবাংশু। মাথার মধ্যেও চলতে থাকে নানান খেলা। সুবর্ণার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক হয়, পরের রবিবার ওরা বাড়ি থাকবে না।

আজ রবিবার। ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে পড়ে দেবাংশু আর সুবর্ণা। আজকের দিনটা সুনীতিবাবুর সান্নিধ্য থেকে রেহাই পেল ওরা। কিন্তু এভাবে প্রতিটা ছুটির দিন তো আর বেরিয়ে যাওয়া যাবে না। তাহলে?

দেবাংশু বলে, ‘উনি এলে দেখা যাবে।’

এ সপ্তাহে শনিবার পড়েছে দোল, অতয়েব অফিস ছুটি। সকালে বারান্দায় বসে রোজকার মতোই চা খাচ্ছিল দেবাংশু। এত সকালে কেউ দোল খেলে না, তাই নিশ্চিন্তে বসেছিল সে। মুখ ঢাকা ছিল খবরের কাগজে। বুঝতেই পারেনি কখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন সুনীতিবাবু।

‘সুপ্রভাত।’

চমকে উঠে কাগজ নীচে নামায় দেবাংশু। ‘ও সুনীতিদা, আপনার আসা টের পাইনি। বসুন। ‘ মনের ভেতরে এক রাশ বিরক্তির মেঘ এসে জমা হতে শুরু করে তার। এখুনি চায়ের ফরমায়েশ করবেন। আজ ছুটি বলে সুবর্ণা এখনও বিছানা ছাড়েনি। কী মুশকিল!

‘দোলটোল খেলা হয় নাকি?’

‘না না। ওসব বয়েস পেরিয়ে এসেছি।’

‘যা বলেছ, রঙের কোয়ালিটি এখন এত খারাপ হয়ে গেছে যে চামড়ায় লাগলে রোগ হয়ে যাবে। তুমি দেখি খুব মন দিয়ে কাগজ পড়ো। খবরের কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে বোঝা যায় না। একেকটা খবরের কাগজ একেক রকম খবর ছাপে।’

‘আমি আসলে এখানকার খবরাখবর নিয়ে মাথা ঘামাই না, দাদা। বিদেশের খবরের দিকেই নজর থাকে আমার।’

‘বিদেশের খবর! কেন হে?’

‘ফ্রান্স, ইটালিতে কোভিডের সময় প্রচুর মানুষ মারা যাওয়াতে অনেক বাড়ি খালি হয়ে গেছিল। এখনও বেশ কিছু তেমন বাড়ি আছে। ভাবছি একটা কিনব।’ মুখচোখ  সিরিয়াস করে কথাগুলো বলে দেবাংশু।

অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সুনীতিবাবু। ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না কী মন্তব্য করা উচিত। ইতিমধ্যে সুবর্ণা উঠে এক কাপ চা বানিয়ে সুনীতিবাবুকে দিয়ে বলল, ‘চিড়ের পোলাও করব, খাবেন?’

‘চিড়ের কিছু কোরো না আজ, আমার কন্সটিপেশনের সমস্যাটা বেড়েছে, চিড়ে খেলে আরও বাড়বে। দুধ মুড়ি খেয়ে নেব।’ দেবাংশুর কথার টোনে সুবর্ণা  ইঙ্গিত বুঝে যায়।

‘ও আচ্ছা আচ্ছা, সরি দাদা। আপনাকে আর একদিন খাওয়াব।’

‘আরে ঠিক আছে, বৌমা। ওসব হবে’খন। আমি বরং আজ উঠি, রাস্তায় রঙ খেলা শুরু হয়ে যাবে এবার। ছোট ছেলেপিলেরা পিচকিরি দিয়ে গায়ে রঙ দিয়ে দেবে। পরে আসব।’

সুনীতি আশ দৃষ্টির বাইরে যেতেই দেবাংশু সুবর্ণাকে বলে, ‘আজ কেলো করেছিলে প্রায়। চিঁড়ের পোলাও শুনে আরও কতক্ষণ বসতেন কে জানে। প্রতি ছুটির দিনেই যদি এসে বসে থাকেন তাহলে তো নিজেদের মতো করে ছুটিই কাটানো যাবে না। এরপর এলে চা-ও দিও না। আমাকে সমীরণদা বারণ করেছেন। বলেছেন, বেশি পাত্তা দিলে জীবন দুর্বিষহ করে দেবেন।

পরের দিন রবিবার। দেবাংশু জানত সুনীতিবাবু আসবেনই। তবে ভদ্রলোকের আবির্ভাব সকালে না হয়ে হল বিকেলে। দেবাংশু ঘরে ছিল। বাইরে থেকে আওয়াজ এল, ‘দেবাংশু আছ নাকি?’

দেবাংশু চকিতে সুবর্ণার দিকে তাকাল। চোখের ভাষায়, ওই এসে গেছেন এঁটুলি পোকা। মুখে বলল, ‘আসুন, ভেতরে আসুন দাদা।’

‘হেঁ হেঁ, আজ একটু দেরি হয়ে গেল আসতে। সকালে ব্যাঙ্কে যেতে হয়েছিল তাই আর আসা হয়নি। এই একটু আসি, দুটো কথা বলে হাল্কা হতে। সবার কাছে তো সব কিছু বলা যায় না। তোমাদের বৈকালিক চা খাওয়া হয়ে গেছে?’

‘আমি চা করে আনছি, আপনি বসুন।’ সুবর্ণা ঘর থেকে বেরোবার মুখেই সুনীতিবাবু বলে ওঠেন, ‘গতকাল যে বিস্কুটটা খাইয়েছিলে, স্বাদে অপূর্ব ছিল। কী বিস্কুট বৌমা? আগে এমনটা খাইনি কখনও।’

‘ওগুলো সুজি বিস্কুট, নিউ মার্কেটে পাওয়া যায়। আজকেও খাওয়াব আপনাকে।’

‘আচ্ছা আচ্ছা, ধন্যবাদ। ভালো জিনিসের কদর করতেই হয় কী বলো দেবাংশু। তা, তুমি এত মন দিয়ে মোবাইলে কী দেখছ হে? মোবাইল বেশি দেখা ভালো নয়, চোখটি যাবে।’

‘বেটিং করছি দাদা। সামনেই আই পি এল- এর ফাইনাল। যদি লেগে যায় তাহলে প্রচুর মাল কামাব। আচ্ছা, আপনাকেই জিগ্যেস করি। বলুন তো সান রাইজার্স হায়দ্রাবাদ না কলকাতা নাইট রাইডার্স — আজ কে জিতবে?’

সুনীতিবাবুর মুখের দিকে তাকাতেই দেবাংশু দেখল, ওর মুখটা ফজলি আমের মতো ঝুলে গেছে। বোবা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন দেবাংশুর দিকে।

‘বলুন দেখি, আপনার কথাতেই নাহয় আজ ফাটকা খেলি।’

‘তুমি জুয়া খেলো?’

‘শুধু আমি কেন, লক্ষ লক্ষ লোক খেলে। একবার অবশ্য ধরা পড়ে জেলে গেছিলাম। সে মাত্র সাত দিনের জন্যে। শুনুন বা সুনীতিদা, এই ফাটকাটায় যদি জিতে যাই, যা পাব তার আদ্ধেক আপনাকে দেব। এবার বলুন, আপনার কী মনে হচ্ছে, কে জিতবে? ‘

‘সেকী!!! জুয়া খেলে তুমি জেল খেটেছ তাও খেলছ? আবার যদি ধরে নিয়ে যায়?’ উদ্ভ্রান্ত মুখে প্রশ্ন করেন সুনীতিবাবু।

হাসি পেলেও অতি সাবধানে তা চেপে রেখে দেবাংশু বলে, ‘সে ধরে নিয়ে গেলে যাবে, আগে তো মালকড়ি কামিয়ে নিই তারপর দেখা যাবে। বলুন না, সুনীতিদা।’

‘আ-আ-আমি ওসব বুঝি না, কিছু জানি না। এসব কোরো না, দেবাংশু, ছেলে বড় হয়েছে, এই ধরনের কাজ মোটেই ভালো নয়।’

‘আমি তো ড্রাগ পেডলিংও করেছি দাদা। ওতে যা টাকা না, ভাবতে পারবেন না। ওই টাকা দিয়েই তো বিদেশে বাড়ি কিনব ভাবছি। দেশের যা অবস্থা না, এখানে আর থাকা যাবে না।’

পুরোপুরি ভেবলে যাওয়া সুনীতি আশ কোনোরকমে বললেন, ‘তো তোমার যখন অ্যাত্ত টাকা তাহলে এরকম সাধারণ বাড়িতে আছ কেন? ‘

‘আরে দাদা, ইনকাম ট্যাক্স, ইডি এদের চোখে ধুলো দিতে, বুঝেলন তো। আপনি আমার দাদার মতো, তাছাড়া ভালো মানুষ, তাই কথাগুলো বললাম। আচ্ছা সুনীতিদা, কোন টিম জিতবে বললেন না তো! যদি লেগে যায়, হিউজ টাকা পাবেন।’

‘আমি, আমি উঠি এবার। কটা জিনিস কিনতে দোকানে যেতে হবে।’

‘আবার আসবেন দাদা। আরও অনেক গল্প করব।’

চটি পরতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে কোনোরকমে সামলে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন সুনীতি আশ।

পাঁচ মিনিট বাদে সুবর্ণার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে দেবাংশু বলে, ‘স্প্রে করে দিয়েছি, মনে হয় এঁটুলি আর এমুখো হবে না।’

দেবাংশুর কথায় সুবর্ণা হাসিতে ফেটে পড়ে। বলে, ‘তোমার মাথায় এসব এলো কী করে? আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। পারোও বটে। আজ ধনেপাতার বড়া করেছি, চায়ের সঙ্গে দিচ্ছি।

‘আও শিখাউঁ তুমহে আন্ডে কা ফান্ডা…’ গুণগুণ করে ওঠে দেবাংশু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *