ফিল্ম রিভিউ
অদিতি বসুরায়
বাবা-মায়ের থেকে দূরে থাকা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে গল্প, ‘অনেক দিন পরে’। প্রবাসে বাস করা, সন্তানদের পিতা-মাতার দুর্গতি নিয়ে বাংলা, বা হিন্দিতে ছবি কম হয়নি – কিন্তু সৌরভ পালধির পথ অন্যরকম। তিনি দু’ পক্ষের অসহায়তাই দেখিয়েছেন তাঁর সাম্প্রতিক ছবিতে। পরিচালক হিসেবে সেখানে তিনি ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র। বহু পুরনো একটা কথাকে তিনি সমানে বলেছেন – বাঁচতে গেলে, একটা পারপাস লাগে। উদ্দেশ্য লাগে – এই কথাটাই মূল উপজীব্য, ‘অনেকদিন পরে’ ছবির। একখানা দালানওয়ালা বাড়িতে থাকেন বয়স্ক ক’ জন অনাত্মীয় মানুষ – ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে পাড়ি দিয়েছে বাইরে। এঁরা সব অসুস্থ, একলা তবু জীবন আঁকড়ে থাকতে চান প্রাণপণ। তাঁদের দেখাশোনা করে মল্লিকা, রেখা, নটবর। মল্লিকা দূর গাঁ থেকে আসে! তার বাড়িতেও শান্তি নেই। মদ্যপ বাবা, মায়ের অশান্তি তাকে ঘরে না টিকতে বাধ্য করে। তার গ্রামেই ‘বাসস্টপে তিন মিনিট’ থামার জন্য, চায়ের দোকান শিবুদার। শিবুদা চা বিক্রি করে – দূর থেকে ক্যামেরায় তাকে দেখে মনে হয়, আসলে সেখানে কবিতা লেখা হয়। মল্লিকা সেখানে দেখা করে, তার বন্ধুর সঙ্গে। সেও বড় একা- ফিরে ফিরে আসে তাই। সে পাশের সিটে রুমাল রেখে, জায়গা করে দেয় মল্লিকার।
অনেকদিন পরে ছবির এক অন্যতম চরিত্র – একাকীত্ব। আধুনিক মানুষের ব্যাধি – এই একলা হতে থাকা। বয়স্ক মানুষ থেকে তরুণ – সবার মধ্যে চারিয়ে থাকা একাকীত্বকে পর্দায় মেলে ধরেছেন পরিচালক। সেই কারণেই, বৃদ্ধ মা, ফাঁকা ফ্রেমে পুত্র- নাতি- পুত্রবধুকে কল্পনা করে অনর্গল কথা বলে যান – মল্লিকা সাইকেলের ব্যাক সিট ঝেড়ে রাখে – গভীর রাতে তারারা জ্বলে নিশ্চুপে – বহুদিন অপেক্ষার পরে চায়ের দোকানী শিবুদা খুঁজে পায় তার সঙ্গিনীকে। না বলা সব কথা, পরপর সব দৃশ্যে আসতে থাকে। পাশাপাশি দেখানো হয়, এক বিপর্যস্ত শিশুকে। যার মা-বাবা আলাদা হয়ে গেছেন – খুঁজে নিয়েছেন নিজ নিজ ভিন্ন সঙ্গীকে – সে এই অকরুণ দুনিয়াকে গ্রহণ করবে না বর্জন করবে – বুঝে উঠতে পারছে না। তার সফরে কেবল মনকেমন লেখা হতে থাকে। এবং আবার পরিচালক স্মরণ করিয়ে দেন, জীবনে লক্ষ্যের মূল্য থাকা কতখানি জরুরি! অসামান্য অভিনয় করেছেন মল্লিকার চরিত্রে চিত্রাংদা শতরূপা। তাঁর সঙ্গীর ভূমিকায় বিমল গিরি দারুণ কাজ করেছেন। দেবেশ রায়চৌধুরী, সঞ্জিতা, শঙ্কর দেবনাথ, সীমা মুখোপাধ্যায়, সুপর্ণা দাশ – ছবির প্রায় সমস্ত অভিনেতাই যথাযথ। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের মাঝে, তাঁদের নতুন সম্পর্ককে মেনে নেওয়া, ছোট্ট মেয়ের ভূমিকায় দরিয়া অসামান্য কাজ করেছে। মানসিক টানাপোড়েনের ব্যাপারটা সে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গীতে ফুটিয়ে তুলেছে। এই ছায়াছবির চিত্রনাট্য চমৎকার – সুলিখিত। সামান্য সব মুহূর্তগুলোতে স্বপ্ন বোনা হয়েছে। সিনেমোটোগ্রাফি আন্তর্জাতিক মানের। সুরকার হিসেবে সপ্তক সানাই দাস, বাংলাগানের স্বর্ণযুগের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। দুর্নিবার সাহার কন্ঠে, ‘মেঘেদের নাম’ গানটির রেশ ছবি শেষের পরেও, মেলায়নি। ন’য়ের দশকের কিছু নস্ট্যালজিয়া ছবির পরতে পরতে গাঁথা – এস টি ডি বুথ, চিঠির বাক্স, মাটির ভাঁড়ে চা, নিরালা চায়ের দোকান, একটেরে শহরতলী দেখে, বুকের ভেতরে জেগে ওঠা নস্ট্যালজিয়া, আমাদের আবেগকে উশকে দেয় নিঃসন্দেহে। তবে ছবির গল্পটি, আরেকটু মনোযোগ দাবী করে। বিশেষ করে, দ্বিতীয়ার্ধটি একটু আরোপিত এবং একপেশে লাগে। তবে, এই ছবির কিছু ফ্রেমকে পরিচালক চিরায়ত কবিতায় উর্ত্তীণ করতে পেরেছেন – গভীর অনুভবের এই ছবি দীর্ঘদিন আপামর মরমী দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে। প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ, এমনভাবে তরুণ পরিচালকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
