ফিল্ম রিভিউ
সুরশ্রী ঘোষ সাহা
মালয়ালম ছবি ‘দৃশ্যম ৩’ দেখলাম হিন্দি ডাবিং-এ। ‘দৃশ্যম’-এর আগের দুটো পর্ব হিন্দিতে দেখলেও জানতাম ‘দৃশ্যম’ ছবি প্রথম দক্ষিণেই তৈরি হয়েছে, পরে সেই ছবি বলিউড বানায়।
তৃতীয় পর্বের শুরুতেই ছোট ছোট ক্লিপিংয়ের মাধ্যমে আগের দুটো পর্বের নানা ঘটনা দর্শককে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্মৃতির ঘরেও বেশ ঝালাই হয়ে গেল।
যাইহোক, এই পর্ব শুরু হল আগের ঘটনার পাঁচ বছর পরের জর্জকুট্টির জীবন দিয়ে। যে মূল চরিত্রের নাম হিন্দি ছবিতে ছিল বিজয় সালগাওকর। এখানে আমি মালয়ালম পদবী ধরেই এগোই। জর্জকুট্টির জীবন এখন স্থিতিশীল। তিনি তাঁর অতীতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি সফল চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং পরিবারের সঙ্গে সুন্দর ভাবে জীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। যদিও আমরা সকলেই জানি, জীবনে একবার কোনভাবে কালো অতীত সৃষ্টি হয়ে থাকলে বাদবাকি জীবনে কখনোই শত্রুর অভাব ঘটে না। এখানেও প্রায় দ্বিতীয় দৃশ্য থেকেই দেখা যায়, ইয়ামি নামের এক নবীন সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান রনি বিজয়ের নবনির্মিত চলচ্চিত্রটির পেছনের বাস্তব ঘটনার ও বিশেষ করে বরুণের মৃত্যুর পরিস্থিতির অনুসন্ধান শুরু করতে নেমেছে। জনসমক্ষে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহল সত্ত্বেও, জর্জকুট্টি চলচ্চিত্রটির সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো যোগসূত্র নেই বলেই জানাচ্ছেন।
গল্প এগোলে দেখি আগে পরিচিত হওয়া বহু চরিত্রই একে একে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। যেমন, জর্জকুট্টির সঙ্গে জোস ও মেরি দেখা করতে এসেছে। মনে পড়ে যায় এরা সেই স্বামী স্ত্রী, যারা পুলিশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্পাইয়ের কাজ করেছিল। আর তা করবে বলে, ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী সেজে বিজয়েরই বাড়িতে ভাড়া থাকত। এখানে দেখা যায় তারা তাদের অতীতের ভুল কাজের জন্য বিজয়ের কাছে ক্ষমা চায়। আর তাদেরকে ক্ষমার মাধ্যমেই আমরা ছবির মূল চরিত্র জর্জকুট্টির আত্মাকে আরো বেশি ভাল ভাবে চিনতে পারি। বিজয় জর্জকুট্টি এমন এক চরিত্র যে নিজের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারেন কিন্তু যারা তাঁর জীবনে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে না, যে গরীবেরা দুটো পয়সার জন্য অন্যায় করে, তাদের তিনি শত্রু মনে করেন না। এখানেও বিজয় তাদের আশ্বস্ত করেন যে জোসের কাজগুলো ভুল ছিল না এবং তাদের জীবন নতুন করে যাতে শুরু হয় সেকারণে আর্থিক সাহায্যও করেন। টের পাই, সঠিক বুদ্ধি নিয়ে জীবনে চলতে শিখলে শত্রুও মিত্র হতে পারে। যেমনভাবে জোসও পরবর্তী দিনে জর্জকুট্টির একজন বিশ্বস্ত বন্ধু ও আস্থাভাজন হয়ে ওঠে।
মানুষের জীবনে যেমন এক একটা সময় আসে যখন আমরা প্রত্যেকেই আমাদের পারিবারিক সাংসারিক ক্ষেত্রে মূলত একটা বিষয়ের উপর ফোকাস করতে চাই। ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথরের মতো ধ্যান জ্ঞান মন প্রাণ বিসর্জন করি একটা কিছু পেতে। সিনেমার এই পর্বে দেখা যায়, জর্জকুট্টি ও তাঁর স্ত্রী রানীর জীবনে মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁদের মেয়ে অঞ্জুর বিবাহ দেওয়া এবং দিন রাত এক করে উপযুক্ত পাত্র খুঁজে চলা। ঘটককে পয়সা দিয়ে একটার পর একটা পাত্রের সন্ধান চলতে থাকে। কিন্তু প্রতিটি সম্ভাবনাময় বিয়ের প্রস্তাবই অজ্ঞাত কোনো পক্ষের বাধায় বারবার ভেস্তে যায়। আর এভাবেই কাহিনি জমে উঠতে শুরু করে দুধের উপর জমা ঘন সরের মতো। অতীতের খারাপ স্মৃতি বিজয়ের পাশাপাশি দর্শককেও তাড়িয়ে বেড়ায়।
মানুষের শত্রু কি শুধু একটাই থাকে! না, শত্রুরও শাখা প্রশাখা ছড়ায়। এখানে যেমন জর্জকুট্টি যখন জানতে চান তারা কারা, যারা তাঁর মেয়ের প্রতিটা সম্বন্ধ কেঁচিয়ে দিচ্ছে বারবার! তখন চমকে দেওয়ার মতো দুটি মানুষ সামনে এসে উপস্থিত হয়। তাহলে খুলেই বলি, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা সুরেশ বাবুর সহায়তায় জর্জকুট্টি যখন সেইসব ফোন কলগুলোর উৎস শনাক্ত করেন তখন জানতে পারেন যে দিনরাত ছায়ার মতো পাশে থাকা রাজন ও তাঁর স্ত্রী শান্তিই এই কলগুলো করছিলেন। রাজনকে মনে পড়ে? সেই যিনি অতীতে জর্জকুট্টিকে সহায়তা করার কারণে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন এবং চরম ব্যক্তিগত ও আর্থিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিলেন! যাতে তাঁর মেয়ের পড়াশোনা ব্যাহত হয় এবং মেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আর চিরকালের মতো কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। জর্জকুট্টি রাজনের পরিস্থিতির কথা কখনোই আমলে নেননি, সেকারণে রাজন নিজেকে উপেক্ষিত মনে করেন এবং তাঁর প্রতি ক্ষোভ পোষণ করেই এই পদক্ষেপ নেন। এইভাবেই কাহিনিকার আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন উপকারীকে ভুলতে নেই কখনো। ঠিক এমনিভাবে পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকবার দেখা গেছে, শুধুমাত্র বুদ্ধির বলে পার পেয়ে যাওয়া বিজয় জর্জকুট্টি নিজ কৃতকর্মের জন্য আফসোসের মালা গাঁথছেন।
এর কিছুকাল পরেই, বিজয়ের স্ত্রী রানী এলাকায় এক অপরিচিত ব্যক্তিকে দেখার কথা জানালে জর্জকুট্টি তাঁর বাগানের কাছে সন্দেহজনক কার্যকলাপ লক্ষ্য করেন। তিনি আবিষ্কার করেন যে সেখানে একটি গর্ত খোঁড়া হয়েছিল এবং পরে তা আবার ভরাট করে ফেলা হয়েছে। তাঁর এই অনুসন্ধান কার্যক্রম গোপনে পর্যবেক্ষণ করেন সহদেবন। পুলিশ বাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর সহদেবন মানসিকভাবে অস্থির ও চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। এই সাস্পেন্ড পুলিশের চরিত্রে ফোকাস হতেই জানা যায়, সাংবাদিক ইয়ামি আর কেউ নয়, তাঁরই মেয়ে। তিনি তাঁর মেয়ের মাধ্যমেই জর্জকুট্টির বিরুদ্ধে লুকিয়ে তদন্ত চালাচ্ছেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করানোর চেষ্টা করছেন। জর্জকুট্টির শেষ দেখে ছাড়বেন, এমন মনোভাব রেখেই সেই বরখাস্ত সাব ইন্সপেক্টর সহদেবন জোর করে অঞ্জুর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রঞ্জিনীর কাছ থেকে চিকিৎসার নথিপত্র সংগ্রহ করেন এবং মামলার সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাত কঙ্কালের বিষয়ে আরও তথ্য জানার জন্য পাথরোসকে ভয় দেখান। শেষে বিষয়টি ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ থমাস বাস্তিনের কানে গিয়ে পৌঁছয়। যার ফলে তিনি সহদেবনকে জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তারেরও নির্দেশ দেন। কিন্তু গ্ৰেপ্তার হন না। কারণ তাঁর পিছনেও যে কেউ আছেন। কে তিনি?
এই জায়গায় এসে কাহিনি আরোই পিছন দিকে জোর পায়ে হাঁটতে শুরু করে। আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান বিজয় জর্জকুট্টির প্রধান শত্রু প্রভাকর। যাঁকে আমরা প্রথম দুটি পর্বেই পেয়েছি শান্ত, ক্ষমাশীল মানুষ হিসেবে। তখন তাঁর স্ত্রী ছিলেন লড়াকু মানসিকতার। কিন্তু দেখা যায় তাঁর স্ত্রী গীতার সেই শত্রুতা টিকিয়ে রাখার মানসিক জোর টেকেনি। একমাত্র সন্তান বরুণের শেষকৃত্য ও তার মৃত্যুর রহস্যময় পরিস্থিতির কারণে তীব্র বিষণ্নতায় ভুগছেন। গীতার অবস্থার প্রতি উদ্বেগ এবং জর্জকুট্টির অবাধে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে, এবার তাঁর সেই শান্ত নিরীহ স্বামী প্রভাকরই জর্জকুট্টির মেয়েকে জেলে ঢোকানোর চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা দর্শক হিসেবে টের পাই, হ্যাঁ, এভাবেই তো মানুষ বদলায়। তিনিই সহদেবনকে কাজে লাগিয়েছেন এবং প্রমাণ সংগ্রহ ও মামলাটি পুনরায় চালু করার জন্য বাস্তিনের সহায়তা চাইতে এসেছেন।
দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজানো প্রচন্ড সাসপেন্সে ভরা এই গল্প বলা আমাকে এখানেই থামাতে হবে। নইলে স্পয়লার দেওয়া হয়ে যাবে। ‘দৃশ্যম ৩’-এর বাকি সাসপেন্স দর্শকের জন্যই তোলা থাক বরং। অনেকগুলো প্রশ্ন ঢুকিয়ে দেওয়া যাক দর্শকের মাথায়।
অঞ্জুর জন্য কি সঠিক পাত্র খুঁজে পাবেন জর্জকুট্টি? আদৌ কি বিবাহের স্বাদ পাবে ঐ ছোট্ট মেয়েটি! নানা ভাবে ষড়যন্ত্র ক’রে জর্জকুট্টিকে কি শাস্তি দিতে সক্ষম হবেন বরুণের বাবা প্রভাকর? বদমেজাজি, প্রতিশোধপরায়ণ হিংস্র সহদেবনের কী হবে শেষমেশ? আর সর্বশেষ প্রশ্ন, এই ৩ পর্বই কি অন্তিম পর্ব ‘দৃশ্যম’ মুভির?
দর্শক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাজন প্রাইমে ঢুকুন। আর আমি বরং এই ছবির শেষ দৃশ্যে মজে থাকি আরো কটাদিন। ভাবতে থাকি একজন প্রকৃত পিতা নিজের সন্তানকে রক্ষা করার জন্য কী না কী করতে পারেন! এমন বাবা ঘরে ঘরে থাকুন।
