টালমাটাল টলিউড ১
প্রিয়ব্রত দত্ত
সন্দেহ নেই এই মুহূর্তে টালিগঞ্জ ফিল্ম ও টেলিভিশন (নতুন সংযোজন ওটিটি) ইন্ডাস্ট্রি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক পালাবদলের আগে টালিগঞ্জ ছিল ভেতরে ভেতরে টগবগ করে ফুটতে থাকা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মত। এখন টালমাটাল। জ্বালা মুখ দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসছে ক্ষোভের লাভা। সেই সর্বগ্রাসী উদগিরণে ছন্নছাড়া হয়ে গেছে, গত পনেরো বছর ধরে ছড়ি ঘোরানো স্বঘোষিত ছায়া-কর্তাদের দল। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই যে, অগ্নিগর্ভ ময়দানে ইট থেকে ইজ্জত, কাদা মাখা জুতো থেকে ক্লেদ লেপা কলাকৌশল সব শূন্যে ওড়াউড়ি করছে। ডিম্যান্ড বাড়িয়ে ডিম সেই আসরের ডেয়ারডেবিল ক্যারেকটার। একই ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মীদের মধ্যে এমন মারামারি, গালাগালি, ডিম ছোঁড়াছুড়ি গত বত্রিশ বছরের সাংবাদিক জীবনে দেখিনি। বাসা থেকে বিতাড়িত ঘুঘুর দল। কিন্তু বল ও বীর্য নিয়ে যারা বাসার বিহেভিয়ারে বদল ঘটানোর জন্য কোমরে আঁচল গুজে, পাঞ্জাবির পাশ দিয়ে ইষৎ হেলে জিনসের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে উদ্ধারকারির যে দল দলা পাকানো টালিগঞ্জের টেরেসে বসতে চাইছেন, তাঁরও ঘুঘু না হোক, এক এক জন ঘাঘু তো বটেই।
বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এই ‘ফিল্ম জড়ানো’ অভিনব অবস্থা দেখে যদি কেউ বলেন, আহা… আগে কী ছিল… এখন কী হয়েছে… আমি বলব, হয় তিনি হাওয়া মোরগ। যখন যেমন, তখন তেমন মেকআপ নিয়েছেন। আর না হলে হাল আমলের হিপোক্রিট। এঁরাই সবচেয়ে বিপজ্জনক বস্তু। একদা হলে, হলে পাড়ায়, পাড়ায় প্রোজেক্টার মেশিনে ফিল্মের রিল ভরে সিনেমা দেখানো হত। খ্যার খ্যার করে আওয়াজ তুলে সেই মেশিনগুলো পর্দায় প্রতিবিম্বিত করত চলচ্ছবি। চলতে চলতে মেশিনগুলোকে ভূতে ধরত, আর ফিল্ম ঘুরতে ঘুরতে পটাং করে ছিঁড়ে গিয়ে মেশিনের ফাঁক ফোকরে জড়িয়ে যেত। এই ‘বিঘ্ন ঘটার জন্য দুঃখ’ পাওয়ার সময়টা কখনও দশ মিনিট, আবার কখনও ঘন্টা আধেকও লেগে যেত। এই ‘ফিল্ম জড়ানো’ সময়টা ‘চায়ে গরম’ বা ‘ঘটি গরম’-এ পার করে বাঙালি বিনোদন কুড়তো এসিহীন হলের সহস্র পাখার বিচিত্র শব্দের সান্নিধ্যে। জড়ানো ফিল্মের জট পাকানো জটিল পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করার মত টেকনিশিয়ান তাও মজুত থাকত। এখনকার জগাখিচুড়ি ফিল্ম জড়ানো অবস্থা থেকে বাংলার বিনোদন জগতের চাকা ঘোরানোর মত চৌখস মানুষ কোথায়? যাঁরা আছেন, তাঁরা ডিম ছুঁড়তে ব্যাস্ত।
আমি যখন টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ায় পা রেখে শক্ত মাটির সন্ধান করছি, তখন প্রবল বাম জমানা। মেহনতি মানুষের সরকার। স্টুডিও পাড়ায় মগজ ও মেহনত দুটোই সমান তালে চলে। একে অপরের পরিপূরক। তাল ঠুকে না চললেই সমস্যা। মেহনতি মানুষ ঘামে ভেজা জামা ঠিক মত কাচতে না পারলে বুর্জোয়া পুঁজিপতিদের শোষণ ও শাসনের কলঘরেই যত ক্ষোভ আছড়ে পড়ে। ওদিকে মগজে কার্ফিউ লাগলে কারখানার ঝাঁপে লাঠি। তাই একে অপরকে সমঝে চললেও, ঠোকাঠুকি লেগেই থাকত।
ক্রমে এল, আমরা ২৩০, ওরা পঁয়ত্রিশের জমানা। জামার কলারটা আর একটু উঠল। বুকের পাঁজর ছাপ্পান্ন হল কিনা জানি না, ইঞ্চি পাঁচেক করে বাড়ল। শিল্পীদের মধ্যেও সঞ্জিবীত হল প্রলেতারিয়েতের পাঠ। উজ্জীবিত হয়ে উঠে এক শ্রেণির ‘বাম মনস্ক’ শিল্পী স্বঘোষিত কেষ্টবিষ্টু হয়ে উঠলেন। শ্যুটিং-এর আগে, পরে, মাঝে আলিপুর কিংবা আলিমুদ্দিনে তাঁদের যাতায়াত বাড়তে লাগল। আসতে আসতে পন্থী ও পন্থার মেরুকরণ হতে শুরু করল। বাম মনস্ক পরিচালক, শিল্পীরা সমাজে সমাদৃত হতে শুরু করলেন। তখন বুদ্ধিজীবী মানেই বামপন্থী। ফলে নিজেকে বুদ্ধিজীবী প্রমাণ করতে টালিগঞ্জ হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। এই বাম মনস্ক বুদ্বিজীবী টাইপ শিল্পীদের দুঃখ-সুখের দরদী অভিভাবক হয়ে উঠলেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়।
তখনও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হননি। তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী। ওদিকে গদার, ত্রুফো, ফেলিনি, এদিকে সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণালদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ভাষায়, ‘কালচার-ফালচার’ করা মানুষ। রাইটার্সের পর তাঁর অবস্থান নান্দনিক পীঠস্থান নন্দন। বন্ধু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ঘোষদের মত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন চলচ্চিত্র ব্যাক্তিত্বরা। অঞ্জন চৌধুরী, সুখেন দাস, স্বপন সাহা ইত্যাদি প্রভৃতি বউমা সিরিজ করা আর বাবা কেন চাকর প্রশ্ন তোলা পরিচালকদের ধর্তব্যের মধ্যেই আনতেন না তিনি।
এই বাতাবরণে প্রযোজকরা সবাই বুর্জোয়া। পয়সা মারার পীঠস্থান। প্রাপ্য না মিটিয়ে ছবি রিলিজ হয়ে গেল। তার তিন বছর পর বহু কিকুতি মিনতি করে হয়তো প্রাপ্যের তিন শতাংশ ‘পেমেন্ট’ পেলেন সংশ্লিষ্ট ছবির টেকনিশিয়ান অথবা তৃতীয় শ্রেণির কোনও আর্টিস্ট। উত্তম জমানার পরবর্তীতে টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এমন অরাজক অবস্থা দিনকে দিন বাড়ছিল। তবে সৌমিত্র থেকে শুরু করে প্রসেনজিৎ, চিরঞ্জিৎ, তাপস পাল বা দেবশ্রী, শতাব্দী, ঋতুপর্ণা কিংবা তরুণ মজুমদার, তপন সিংহ, মৃণাল সেনরা প্রাপ্য অর্থ না পেয়ে ক্ষোভ বা বিরক্তি প্রকাশ করছেন এমনটা দেখিনি। যত বঞ্চনা, সব ওই নীচু তলায়। মেহনতিদের মহল্লায়।
টালিগঞ্জের শিল্পী, কলাকুশলদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ফেডারশন নামে একটি সোনার পাথরবাটি সেদিনও ছিল। ছিল আর্টিস্ট ফোরাম। টেকনিশিয়ান ও ডিরেক্টর্স গিল্ড। ফেডারেশনের সমান্তরাল আর একটি সংগঠন ছিল। তার নাম ব্রোটা। ব্রোটা সংক্ষিপ্ত ফর্ম। পুরো নামটা মনে পড়ছে না। এই দুই সংগঠনের মধ্যে ফেডারশনের পাল্লা ভারী ছিল। ব্রোটার সদস্য সংখ্যাও কম ছিল না। কিন্তু স্টুডিও পাড়ায় ফেডারেশনের প্রভাব ছিল বেশি। ফিল্ম ও টেলিভিশনের হোমড়া চোমড়ারা ছিল ফেডারশনের মেম্বার। সেই ফেডারেশনের ফতোয়ায় মহাপ্রভু সিরিয়ালে অধিকাংশ আর্টিস্টটের মুণ্ডিত মস্তক থাকলেও একাধিক হেয়ার ড্রেসার রাখতে বাধ্য হতেন পরিচালক দেবাংশু সেনগুপ্ত। দ্রৌপদী ধারাবাহিকে রূপা গাঙ্গুলির কাঁচুলির উপর ওড়না ফেলতে হয়েছিল পরিচালক অভিজিৎ দাশগুপ্তকে। প্রোডাকশনের গাড়ি ফেডারেশন নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কম নেওয়ার জন্য গালে থাপ্পড় খেতে হয়েছিল প্রযোজক অশোক ধানুকাকে। এই রকম তম্ভিবাজীর অজস্র উদারহরণ খুঁজলে পাওয়া যাবে ২০১১-র আগের টলি ও টেলি পাড়ায়। ব্রোটা এতটা জঙ্গী মনোভাবাপন্ন ছিল না। আবার সমঝোতার পক্ষেও ছিল না। যে প্রযোজক ব্রোটার সদস্যদের নিয়ে প্রোডাকশন টিম তৈরি করতেন, তিনি ফেডারেশন ব্রাত্য। দাবি করা হত ফেডারশন সরকার স্বীকৃত শ্রমিক সংগঠন। সেই জোরে ফেডারশনের ফান্ডারা ডাণ্ডা হাতে হঠাৎ ফ্লোরের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে ব্রোটা পোষিত প্রযোজনা ভণ্ডুল করে দিত। তার জেরে হয়তো দুদিন ধরে শ্যুটিং বন্ধ। স্টুডিও সাড়া থমথমে। বিকেলের পর এনটি ওয়ান, টেকনিশিয়ান স্টুডিও গমগমে। প্রযোজক, পরিচালকরা বাগানে তেলেভাজা মুড়ি খাচ্ছেন। রাতে হাঁড়ি চড়বে কিনা সেই দুশ্চিন্তা মুখে নিয়ে থম মেরে বসে আছেন টেকনিশিয়ানরা।
বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকাটা ছিল শ্যামও রাখি, কুলও রাখির মত। ১৯৯৯ সালে রাসবিহারী থেকে, ২০০৬ সালে আলিপুর থেকে দুই বারের জয়ী বিধায়ক। সেই সময়ে স্টুডিও পাড়ার নির্বাচিত প্রতিনিধি তথা অভিনেতা। পর্দায় যতই শয়তানি করুন না কেন, ব্যক্তিগত স্তরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর দারুণ সখ্যতা ছিল। স্টুডিও অচল হলেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর প্রসেনজিৎ, তাপস পালকে নিয়ে মহাকরণে মুখ্যমন্ত্রী তথা সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর ঘরে মিটিং-এ বসতেন। থাকত যুযুধান দুই পক্ষ ফেডারেশন ও ব্রোটা। সাময়িক সমস্যার সমাধান হত। মাস কয়েক ঠিকঠাক চলল। তারপর আবার যে কে সেই। সামান্য ইস্যু নিয়ে স্টুডিও পাড়া তোলপাড়। এই রকম বেশ কয়েকবার বৈঠকের পর বুদ্ধবাবু কিছু পদক্ষেপ নিলেন।
টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ার সংকট মোচনে সেই সময়কার উদ্যোগ ও বৈঠকের মূল দিকগুলো ছিল মূলত ১) পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ: টালিগঞ্জের পুরনো স্টুডিওগুলির প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নতুন আধুনিক শুটিং সরঞ্জাম আমদানির বিষয়ে আলোচনা হয়। ২) আর্থিক সংকট ও অনুদান: বাংলা সিনেমার দর্শক কমে যাওয়া এবং সিনেমা হলগুলির ধুঁকতে থাকা অবস্থা রুখতে সরকারি ভর্তুকি ও সহায়তার দাবি জানানো হয়। ৩) প্রযুক্তিবিদ ও শিল্পীদের স্বার্থ: স্টুডিও পাড়ার টেকনিশিয়ান এবং জুনিয়র শিল্পীদের কাজের পরিবেশ ও পারিশ্রমিক সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে কথা হয়। ৪) পাইরেসি রোধ: সেই সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের বড় শত্রু ‘পাইরেসি’ বা বেআইনি সিডি চক্র রুখতে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছিল। শিল্পীদের ভূমিকা ও উদ্যোগ।
আগেই বলেছি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ‘আর্টিস্ট ফোরাম’ এবং টলিউডের অন্যান্য সংগঠনের পক্ষ থেকে স্টুডিও পাড়ার মূল দাবিগুলি তুলে ধরার জন্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ইন্ডাস্ট্রির তৎকালীন শীর্ষ নায়ক হিসেবে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বাণিজ্যিক সিনেমা বাঁচানোর তাগিদে সরাসরি এই আলোচনাগুলিতে অংশ নিতেন। স্টুডিওর কর্মসংস্কৃতি বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করতেন।
গৃহীত পদক্ষেপ ও ফলাফল হিসেবে রূপায়ণ স্টুডিওর আধুনিকীকরণ করা হল। সরকারি উদ্যোগে বেশ কিছু স্টুডিওর প্রযুক্তিগত মান উন্নতও করা হয়। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (KIFF) প্রধান মুখ হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এছাড়াও সিনেমা হলগুলির অবস্থা শোধরাতে বিনোদন করে (Entertainment Tax) কিছু ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু আসল গলদটা রয়েই গেল। সেটা হল অন্তর্দ্বন্দ্ব।
