টিংলুং
মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়
এত বছর পর সুযোগ মিলল। সেই কবেকার কথা! প্রায় ভুলতে বসেছিল। হঠাৎই কাগজের কোণে ছোট বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে যায় কৌস্তভের।
কৌস্তভকে সপ্তাহে দুদিন অফিস যেতে হয়। বাকি তিনদিন ওয়ার্ক ফ্রম হোম। আজ তাই। কৌস্তভের মায়ের অভ্যেস চায়ের কাপ খবরের কাগজের ওপর রাখা। সেই কাগজ পুরনো হতে পারে বা আজকেরও হতে পারে। তাতে কৌস্তভের মায়ের কিছু যায় আসে না। কৌস্তভ অনেক বলেও অভ্যেস বদলাতে পারেনি। তবে হালও ছাড়েনি। চায়ের কাপ হাতে তুলে মাকে ডাকতে যায়। ডাকা হয় না। কাগজের কোণে একচিলতে বিজ্ঞাপনে কৌস্তভের চোখ আটকে যায়।
‘নদী বিক্রয় আছে। আপনি ইচ্ছুক? তাহলে সত্বর যোগাযোগ করুন। বড়, মেজ, সেজ, ছোট বিভিন্ন ধরনের নদী আছে। আগে এলে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়া যাবে। আগ্রহীরা নিচের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করুন।’
তড়বড়িয়ে ওঠে কৌস্তভ। তড়িঘড়ি কাগজটা তুলে তারিখ দেখে। তিনদিনের পুরনো কাগজ। এখনও কি অফারটা আছে? নিকুচি করেছে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের। ফোন তুলে রিং করে।
কবেকার কথা! তিয়াসারা সাঁতরাগাছিতে এল কৌস্তভদের সহ ভাড়াটিয়া হয়ে। দুজনেরই ক্লাস ফাইভ। তিয়াসা ছিল ঝগরুটে নম্বর ওয়ান। কথায় কথায় সাঁতরাগাছির বদনাম করত। বলত, “তোদের এখানে কিছু নেই। বাজে জায়গা। শুধু লোকজন আর দোকানপাট। একটা নদীও নেই। জানিস, আমার একটা নিজস্ব নদী ছিল। নাম টিংলুং। টিংলুং-এর জন্য আমার খুব মনখারাপ করে।”
কৌস্তভ হেসে কুটোপুটি খায়। নদী কারও নিজস্ব হয় নাকি? আবার সেই নদীর জন্য মনখারাপ! কৌস্তভ বুঝতে পারে না নদীর জন্য মনখারাপের ব্যাপারটা। আরে বাবা, মনখারাপ কখন হয়? যখন ক্রিকেট খেলার তোড়জোড় করছে অথচ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে, ফুটবল খেলা শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে টিউশন পড়ার জন্য খেলা শেষ না করে চলে যেতে হচ্ছে, ঘুড়ির প্যাঁচ লাগানোর মুহূর্তে মায়ের কানমলা খেয়ে ঘুড়ি লাটাই ছাদে ফেলে নেমে আসতে হচ্ছে… তখন মনখারাপ হয়।
তিয়াসারা উত্তরবঙ্গে যেখানে থাকত ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে একটা ছোট পাহাড়ি নদী। নাম টিংলুং।
মুখে কিছু না বললেও তখনই ছোটবেলার বন্ধু তিয়াসার জন্য একটি নদী কিনবে ভেবেছে কৌস্তভ!
এত বছর পর প্রায় ভুলতে বসা ভাবনা বাস্তবায়িত করার সুযোগ এলে কেউ ছেড়ে দেয় নাকি?
ছোট একটা খুপরি ঘর। ততোধিক রোগা একজন মানুষ বসে আছেন।
“আমি ফোন করেছিলাম, নদী কেনার ব্যাপারে।” কৌস্তভ বলে।
“আসুন আসুন। কেমন নদী চান? ছোট পাহাড়ি নদী আছে। দেখবেন নাকি?” লোকটি বলে।
কৌস্তভ অবাক হয়। সত্যি এভাবে নদী বিক্রি হয়!
“কী ভাবছেন? আমাদের এখানে সমস্ত কিছু নিয়ম মেনে আইনিভাবে কাগজ তৈরি করে নদী বিক্রি করা হয়। আপনাকে আমাদের ব্রোশিয়োর দেখাই।” লোকটি ব্রোশিয়োর তুলে দেয় কৌস্তভের হাতে।
নদী বিক্রির ব্রোশিয়োর!
কৌস্তভ বাড়ি ফিরল যখন সন্ধে পেরিয়ে গেছে। তিয়াসাও অফিস থেকে এসে গেছে।
“তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
“সারপ্রাইজ!”
“বলব। তার আগে আমায় একটা চুমু দে।”
“বিয়ের পাঁচবছর হয়ে গেল, তাও তোর দুষ্টুমি কমল না।” তিয়াসা ছদ্ম রাগ দেখায়।
“পাঁচবছর! অনেকটা দেরি হয়নি, কী বলিস?”
তিয়াসা অবাক হয়ে দেখে কৌস্তভকে।
“হাঁ করে দেখছিস কী? তোর জন্য নদী কিনছি। অনেকটা টিংলুং-এর মতো।”
“ইয়ার্কি করিস না, কৌস্তভ। ভাল লাগে না।” রাগ দেখায় তিয়াসা।
“ইয়ার্কি! তুই নিজেই দেখ।”
তিয়াসার হাতে কৌস্তভ একটা কাগজ তুলে দেয়। সে একটা বাংলো কিনছে তিয়াসার জন্য।
বাংলোটার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটা ছোট পাহাড়ি নদী।
