জেলা ডাক্তার ( দ্য ডিস্ট্রিক্ট ডক্টর)
ইভান এস. তুর্গেনেভ
অনুবাদ – অজন্তা রায় আচার্য
লেখক পরিচিতিঃ- ইভান সের্গেইয়েভিচ তুর্গেনেভ ছিলেন ১৯ শতকের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী রুশ ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও নাট্যকার। তাঁর রচনা শৈলী সূক্ষ্ম, মনস্তাত্ত্বিক এবং বাস্তববাদী। জন্ম ১৮১৮। মৃত্যু ১৮৮৩। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস “ফাদারস অ্যান্ড সন্স” ।
সেটা ছিল শরতের একটা দিন। দেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ফেরার পথে আমার ঠান্ডা লেগে শরীর খারাপ হল। ভাগ্যক্রমে জ্বর যখন আমাকে চেপে ধরল, তখন আমি জেলা শহরের এক সরাইখানায়। ডাক্তারকে ডেকে পাঠালাম। আধঘণ্টার মধ্যেই জেলা ডাক্তার এসে হাজির হলেন— রোগা, মাঝারি উচ্চতার কালো চুলের একজন মানুষ। তিনি আমাকে সাধারণ ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার ওষুধ দিলেন আর ‘সরষের প্রলেপ’ লাগানোর নির্দেশ দিলেন এবং শুকনো কাশি কাশতে কাশতে অন্য দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পাঁচ রুবলের একটি নোট নিজের আস্তিনে ঢুকিয়ে নিলেন। এরপর তিনি বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠছিলেন, কিন্তু কেমন করে যেন তাকে কথায় পেয়ে বসল এবং তিনি সেখানেই থেকে গেলেন। আমি জ্বরে ক্লান্ত ছিলাম; বুঝতে পারছিলাম যে রাতে ঘুম হবে না, তাই একজন আমুদে সঙ্গী পেয়ে কিছুটা গল্প করতে পেরে ভালোই লাগল। আমাদেরকে চা দিয়ে গেল। ডাক্তারবাবু মন খুলে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বেশ বুদ্ধিমান মানুষ এবং বেশ জোরে ও রসিকতার সঙ্গে কথা বলছিলেন। পৃথিবীতে কত অদ্ভুত সব কাণ্ডই না ঘটে; আপনি হয়তো অনেকের সঙ্গে দীর্ঘকাল বসবাস করছেন এবং তাদের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সঙ্গে কোনোদিনও মনের কথা খুলে বলেননি; আবার কারো সঙ্গে পরিচিত হওয়ার খুব একটা সময়ও হয়তো পাননি, অথচ হঠাৎ করেই আপনি তার কাছে—কিংবা সে আপনার কাছে—নিজের সব গোপন কথা উজাড় করে দিচ্ছেন, যেন আপনি স্বীকারোক্তি করছেন। জানি না আমি কীভাবে আমার এই নতুন বন্ধুর আস্থা অর্জন করেছিলাম—যাই হোক, কোনও ভূমিকা ছাড়াই তিনি আমাকে বেশ অদ্ভুত একটি ঘটনার কথা শোনালেন। প্রশ্রয়দায়ী পাঠকদের অবগতির জন্য আমি সেই কাহিনীটি এখানে তুলে ধরছি। আমি গল্পটি ডাক্তারের নিজের ভাষাতেই বলার চেষ্টা করব।
“আপনি কি চেনেন…?” তিনি দুর্বল এবং কম্পিত কণ্ঠে শুরু করলেন (যা খাঁটি বেরেজোভ নস্যি ব্যবহারের সাধারণ ফল); “আপনি এখানকার বিচারককে চেনেন না? মাইলভ, পাভেল লুকিচ?… আপনি কি তাকে চেনেন না?… আচ্ছা, তাতে কিছু যায় আসে না।” (তিনি গলা পরিষ্কার করলেন এবং চোখ কচলালেন)। “তো দেখুন, ঘটনাটি ঘটেছিল— নির্ভুল ভাবে বলতে গেলে, সেটা ছিল লেন্টের সময়, ঠিক যখন বরফ গলতে শুরু করেছে। আমি তার বাড়িতে বসে ছিলাম—আমাদের বিচারকের বাড়িতে, বুঝলেন তো—বসে ‘প্রেফারেন্স’ খেলছিলাম। আমাদের বিচারক লোকটা বেশ ভালো, এবং প্রেফারেন্স খেলতে খুব ভালোবাসেন। হঠাৎ করে “(ডাক্তার এই ‘হঠাৎ করে’ শব্দটি বারবার ব্যবহার করছিলেন)” তারা আমাকে জানাল, ‘আপনাকে একজন চাকর খোঁজ করছে।’ আমি বললাম, ‘সে কী চায়?’ তারা বলল, সে একটা চিরকুট এনেছে—নিশ্চয়ই কোনো রোগীর কাছ থেকে। আমি বললাম, ‘চিরকুটটা আমাকে দাও।’ তো সেটা এক রোগীরই চিরকুট ছিল—বেশ ভালো কথা—আপনি তো বোঝেনই—এটাই আমাদের রুটি-রুজি… কিন্তু ঘটনাটা ছিল এমন, এক ভদ্রমহিলা, বিধবা, আমাকে লিখেছেন; তিনি বলছেন, ‘আমার মেয়ে মরণাপন্ন। ঈশ্বরের দোহাই, চলে আসুন!’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আপনার জন্য ঘোড়া পাঠানো হয়েছে।’… আচ্ছা, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তিনি শহর থেকে বিশ মাইল দূরে ছিলেন, আর বাইরে তখন মাঝরাত, রাস্তার যা অবস্থা ছিল—বাপ রে! আর যেহেতু তিনি নিজেও গরীব ছিলেন, তাই দুই সিলভার রুবলের বেশি কেউ আশা করতে পারে না, আর সেটাও অনিশ্চিত; হয়তো পারিশ্রমিক হিসেবে বড়জোর এক থান লিনেন কাপড় আর এক বস্তা ওটমিল জুটতে পারে। তবে যাই হোক, আপনি তো জানেন, সবকিছুর আগে কর্তব্য; একজন মানুষ মারা যাচ্ছে। আমি তৎক্ষণাৎ আমার তাসের সেটটি প্রাদেশিক কমিশনের সদস্য কাল্লিওপিনের হাতে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।
আমি গিয়ে দেখি; সিঁড়ির কাছে একটা ভাঙাচোরা ছোট ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তাতে চাষিদের ঘোড়া জোতা, বড্ড মোটা— বেজায় মোটা—আর তাদের গায়ের লোমগুলো নরম কাপড়ের মত ঝুলে পড়েছে। এবং কোচম্যানটি সম্মানের খাতিরে তার টুপি খুলে বসে আছে। তো আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘এটা পরিষ্কার বন্ধু, এই রোগীরা তো আর ঐশ্বর্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে না’…” আপনি হাসছেন; কিন্তু, আমার মতো একজন দরিদ্র মানুষকে সবকিছু বিবেচনা করে নিতে হয়… যদি কোচম্যান রাজপুত্রের মতো বসে থাকত, টুপি না ছুঁয়ে সম্মান জানাত, এমনকি দাড়ির আড়ালে আপনাকে দেখে উপহাস করত আর চাবুক আস্ফালন করত—তাহলে আপনি অনায়াসে ছয় রুবলের বাজি ধরতে পারতেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা। যা-ই হোক, আমি ভাবলাম এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই; সবকিছুর আগে কর্তব্য। আমি সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে রওনা হলাম।
বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমি কোনওমতে সেখানে পৌঁছাতে পেরেছিলাম। রাস্তাটা ছিল নরকতুল্য: নালা, তুষার, জলধারা আর সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হল বাঁধটি হঠাৎ ভেঙে গিয়েছিল— যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত আমি পৌঁছালাম। খড়ের চাল দেওয়া একটি ছোট ঘর। জানলায় আলো জ্বলছিল; তার মানে তারা আমার অপেক্ষায় ছিল। মাথায় টুপি পরা এক বৃদ্ধা নারী আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন, বেশ শ্রদ্ধেয় চেহারার। তিনি বললেন, ‘ওকে বাঁচান! ও মারা যাচ্ছে।’ আমি বললাম, ‘দয়া করে ঘাবড়াবেন না—অসুস্থ রোগীটি কোথায়?’ তিনি বললেন, ‘এই দিকে আসুন।’
আমি একটি পরিষ্কার ছোট ঘর দেখলাম, কোণে একটি বাতি জ্বলছে; বিছানায় বছর কুড়ির একটি মেয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। জ্বরে তার শরীর পুড়ে যাচ্ছিল এবং সে ঘনঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছিল—প্রবল জ্বর। সেখানে আরও দুটি মেয়ে ছিল, তার বোন, তারা ভয়ে কাঁপছিল এবং কাঁদছিল। তারা আমাকে বলল, ‘গতকালও ও একদম ঠিক ছিল এবং খাওয়া দাওয়াও ঠিকমত করেছিল; আজ সকালে ও মাথার মধ্যে কেমন করছে বলল, আর আজ সন্ধ্যায়, হঠাৎ করে দেখছেন তো, এমন হয়ে গেল।’ আমি আবার বললাম: ‘দয়া করে অস্থির হবেন না।’ আপনি তো জানেন—এটা একজন ডাক্তারের কর্তব্য—আমি তার কাছে গেলাম এবং রক্তমোক্ষণ করলাম, তাদের বললাম সরষের প্রলেপ লাগাতে আর একটি মিক্সচার ওষুধ লিখে দিলাম।
ইতিমধ্যে আমি তার দিকে তাকালাম; আমি তার দিকে তাকিয়েই থাকলাম, বুঝলেন তো ভগবানের দিব্যি! আমি এমন মুখ আগে কখনও দেখিনি! এক কথায় সে ছিল সুন্দরী! তার প্রতি করুণায় আমি বেশ বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম। কী চমৎকার গড়ন; কী সুন্দর চোখ!… কিন্তু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! মেয়েটি কিছুটা আরাম বোধ করল; তার ঘাম হতে শুরু করল, জ্ঞান ফিরল বলে মনে হল, চারপাশে তাকিয়ে হাসল এবং নিজের মুখের ওপর হাত বুলিয়ে নিল… তার বোনেরা তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তারা জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছিস?’ সে বলল, ‘ঠিক আছি,’ এবং অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। আমি তার দিকে তাকালাম; সে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি বললাম, ‘এখন রোগীকে একা ছেড়ে দেওয়া উচিত।’ তাই আমরা সবাই পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম; শুধু একজন পরিচারিকা থেকে গেল, যদি তার কোনো প্রয়োজন পড়ে। বসার ঘরে টেবিলের ওপর একটি চা তৈরির পাত্র-সামোভার এবং এক বোতল রাম রাখা ছিল; আমাদের পেশায় ওটা ছাড়া চলা কঠিন। তারা আমাকে চা দিল; আমাকে রাতটা থেকে যেতে অনুরোধ করল… আমি রাজি হলাম, সত্যিই তো, রাতের ওই সময়ে আমি আর কোথায় যেতাম? বৃদ্ধা নারীটি ক্রমাগত কাতরাচ্ছিলেন।
“কী হয়েছে?’ আমি বললাম; ‘সে বেঁচে যাবে; আপনি চিন্তা করবেন না; আপনার বরং এখন একটু বিশ্রাম নেওয়া উচিত; রাত এখন প্রায় দুটো বাজে।’ ‘কিন্তু কোনো কিছু ঘটলে আপনি কি আমাকে ডেকে পাঠাবেন?’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ।’ বৃদ্ধা চলে গেলেন, এবং মেয়েগুলোও তাদের নিজেদের ঘরে চলে গেল; তারা আমার জন্য বসার ঘরে একটি বিছানা তৈরি করে দিল। আমি শুতে গেলাম—কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, আমার চোখে ঘুম এল না! যদিও বাস্তবে আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। আমি কিছুতেই আমার রোগীর চিন্তা মাথা থেকে বের করতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না; আমি হঠাৎ উঠে পড়লাম; মনে মনে ভাবলাম, ‘একবার গিয়ে দেখে আসি রোগী কেমন আছে।’
তার শোবার ঘরটি ছিল বসার ঘরের ঠিক পাশেই। তো, আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং আলতো করে দরজা খুললাম—আমার বুক কী ভীষণভাবে কাঁপছিল! ভেতরে তাকালাম, পরিচারিকাটি ঘুমিয়ে ছিল মুখ বড় করে হাঁ করে, এমনকি সে নাকও ডাকছিল, হতচ্ছাড়া কোথাকার! কিন্তু রোগীটি আমার দিকে মুখ করে শুয়ে ছিল, তার হাত দুটো দুপাশে ছড়িয়ে ছিল, আহা বেচারি মেয়েটি! আমি তার কাছে গেলাম… হঠাৎ সে চোখ মেলল এবং আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল! ‘কে আপনি? আপনি কে?’ আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। বললাম, ‘আতঙ্কিত হবেন না, ম্যাডাম; আমি ডাক্তার; আপনি কেমন বোধ করছেন তা দেখতে এসেছি।’ ‘আপনি ডাক্তার?’ ‘হ্যাঁ, ডাক্তার; আপনার মা আমাকে শহর থেকে আনিয়েছেন; আমরা আপনার রক্তমোক্ষণ করেছি, ম্যাডাম; এখন দয়া করে ঘুমানোর চেষ্টা করুন, আর দু-এক দিনের মধ্যেই, ঈশ্বর চাইলে, আমরা আপনাকে আবার সুস্থ করে তুলব। আপনি আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন।’ ‘আহ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডাক্তার, আমাকে মরতে দেবেন না… দয়া করে, দয়া করে।’
‘আপনি কেন এমন কথা বলছেন? ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন!’ আমি মনে মনে ভাবলাম, তার বোধহয় আবার জ্বর এসেছে; আমি তার নাড়ি পরীক্ষা করলাম; হ্যাঁ, তার প্রচণ্ড জ্বর ছিল। সে আমার দিকে তাকাল এবং তারপর আমার হাত চেপে ধরল। ‘আমি কেন মরতে চাই না তা আপনাকে বলব: আমি আপনাকে বলব… এখন আমরা একা; এবং শুধু— দয়া করে আপনি… কাউকে বলবেন না… শুনুন…’ আমি নিচু হলাম; সে তার ঠোঁট দুটো একদম আমার কানের কাছে নিয়ে এল; তার চুল আমার গালে স্পর্শ করল—আমি স্বীকার করছি আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল—এবং সে ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করল… আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না… আহ, সে প্রলাপ বকছিল!… সে কেবল ফিসফিসিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু এত দ্রুত যে মনে হচ্ছিল সেগুলো রাশিয়ান ভাষা নয়; অবশেষে তার কথা শেষ হলো, এবং কাঁপতে কাঁপতে বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে সে আমাকে আঙুল তুলে শাসাল, ‘মনে রাখবেন ডাক্তার, কাউকে বলবেন না।’ আমি তাকে কোনোভাবে শান্ত করলাম, পান করার জন্য কিছু দিলাম, পরিচারিকাটিকে জাগিয়ে দিলাম এবং চলে এলাম।”
কথা বলতে বলতে ডাক্তার আবারও প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে নস্যি নিলেন এবং এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, নস্যির প্রভাবে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেছেন।
“যাই হোক,” তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “পরদিন আমার প্রত্যাশার বিপরীতে রোগীর অবস্থার কোনও উন্নতি হল না। আমি অনেক ভাবলাম এবং হঠাৎ ওখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, যদিও অন্যান্য রোগীরা আমার অপেক্ষায় ছিল… আর আপনি তো জানেন, সেটাকে অবজ্ঞা করা যায় না; কেউ এমনটা করলে তার পেশার ক্ষতি হয়। কিন্তু, প্রথমত, রোগীটি সত্যিই বিপদের মধ্যে ছিল; আর দ্বিতীয়ত, সত্যি বলতে কি, আমি তার প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করছিলাম। তাছাড়া, আমার পুরো পরিবারটিকেও ভালো লেগেছিল। যদিও তাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল, তবুও আমি খুব ভালো ভাবে লক্ষ্য করে বুঝেছিলাম, তারা ছিল বিশেষভাবে মার্জিত ও শিক্ষিত মানুষ… তাদের বাবা ছিলেন একজন জ্ঞানী মানুষ, একজন লেখক; তিনি অবশ্য দারিদ্র্যের মধ্যেই মারা গেছেন, কিন্তু মারা যাওয়ার আগে তিনি তার সন্তানদের চমৎকার শিক্ষা দিয়ে যেতে পেরেছিলেন; তিনি প্রচুর বইও রেখে গিয়েছিলেন।
হয়তো আমি খুব যত্ন সহকারে অসুস্থ মেয়েটির সেবা করছিলাম বলে, কিংবা অন্য কোনো কারণে; যাই হোক, আমি এটুকু বলার সাহস রাখি যে বাড়ির সবাই আমাকে এমনভাবে ভালোবাসতে শুরু করেছিল যেন আমি তাদেরই পরিবারের একজন… ইতিমধ্যে রাস্তার অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হয়ে গেল; বলতে গেলে সব যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল; এমনকি শহর থেকে ওষুধ আনানোও কঠিন হয়ে দাঁড়ালো… অসুস্থ মেয়েটি সুস্থ হচ্ছিল না… দিনের পর দিন, দিনের পর দিন… কিন্তু… এখানে…” (ডাক্তার অল্প সময়ের জন্য থামলেন।) “আমি বুঝতে পারছি না আপনাকে কীভাবে বলব…” (তিনি আবারও নস্যি নিলেন, কাশলেন এবং সামান্য চা পান করলেন।)
“আমি ভূমিকা না করেই আপনাকে বলছি। আমার রোগী… কীভাবে বলি?… আসলে সে আমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল… অথবা, না, এটা ঠিক প্রেম ছিল না… যাই হোক… আসলে একজন কীভাবে বলবে?” (ডাক্তার নিচের দিকে তাকালেন এবং লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন।) “না,” তিনি দ্রুত বলতে শুরু করলেন, “প্রেমই বটে! একজন মানুষের নিজেকে নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব করা উচিত নয়। সে ছিল একজন শিক্ষিত মেয়ে, বুদ্ধিমান এবং প্রচুর বই পড়া মেয়ে; আর আমি তো বলতে গেলে আমার লাতিন ভাষাও পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলাম। আর চেহারার কথা যদি বলেন” (ডাক্তার হাসিমুখে নিজেকে একবার দেখে নিলেন) “তা নিয়েও বড়াই করার মতো আমার কিছু নেই। কিন্তু সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আমাকে তো আর বোকা বানাননি; আমি কালোকে সাদা বলি না; আমি দুনিয়াদারির কিছু তো বুঝিই; আমি খুব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম যে, উদাহরণস্বরূপ আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা—ওটাই ছিল তার নাম—সে আমার প্রতি ঠিক প্রেম অনুভব করছিল না, বরং তার এক ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ টান ছিল—বলতে পারেন আমার প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা বা ওই জাতীয় কিছু। যদিও সে নিজে হয়তো এই অনুভূতিটিকে ভুল বুঝেছিল, যাই হোক এটাই ছিল তার মনোভাব; এ নিয়ে আপনি আপনার নিজের রায় দিতে পারেন। কিন্তু” ডাক্তার যোগ করলেন…
তিনি এক নিঃশ্বাসে এবং স্পষ্ট অস্বস্তি নিয়ে এই এলোমেলো বাক্যগুলো বলে ফেললেন, ‘আমি বোধহয় খেই হারিয়ে ফেলছি—আপনি এভাবে কিছুই বুঝতে পারবেন না… যাকগে, আপনার অনুমতি নিয়ে আমি সবকিছু গুছিয়ে বলছি।’
তিনি এক গ্লাস চা পান করলেন এবং শান্ত স্বরে বলতে শুরু করলেন। ‘হ্যাঁ, তারপর। আমার রোগীর অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যেতে থাকল। মশায়, আপনি তো আর ডাক্তার নন; আপনি বুঝতে পারবেন না একজন বেচারা ডাক্তারের মনের ওপর দিয়ে কী বয়ে যায়, বিশেষ করে শুরুতে, যখন সে সন্দেহ করতে শুরু করে যে রোগটি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তখন নিজের ওপর বিশ্বাসের কী দশা হয়? আপনি হঠাৎ এতটাই ভীতু হয়ে পড়েন যে তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। আপনার তখন মনে হয় যে আপনি যা জানতেন তার সবকিছুই ভুলে গেছেন, রোগীর আপনার ওপর কোনও আস্থা নেই, এবং অন্য মানুষজনও আপনার দিশেহারা অবস্থা লক্ষ্য করতে শুরু করেছে; তারা আপনাকে অনিচ্ছার সঙ্গে রোগের লক্ষণগুলো বলছে; তারা আপনার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, ফিসফিস করছে… আহ! সে এক ভয়ানক অবস্থা! আপনি ভাবেন, নিশ্চয়ই এই রোগের কোনও প্রতিকার আছে, যদি তা খুঁজে পাওয়া যেত। এটাই কি সেটা নয়? আপনি চেষ্টা করেন—না, এটা নয়! আপনি ওষুধটিকে কাজ করার মতো প্রয়োজনীয় সময়টুকু দেন না… আপনি একবার এক জিনিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, পরক্ষণেই অন্য কিছুতে। মাঝে মাঝে আপনি চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র লেখা একটি বই তুলে নেন—আর ভাবেন, এই তো এখানে আছে! মাঝে মাঝে, ভাগ্যের দোহাই দিয়ে আপনি দৈবক্রমে একটি বেছে নেন, ভাবেন সব ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেবেন… কিন্তু ইতিমধ্যে একজন মানুষ মারা যাচ্ছে, অথচ অন্য কোনো ডাক্তার হয়তো তাকে বাঁচিয়ে ফেলতেন। তখন আপনি বলেন, ‘আমাদের অন্য কারো পরামর্শ নেওয়া দরকার; আমি একাই এই দায়ভার নিতে পারব না।’ আর সেই সময়ে আপনাকে কী ভীষণ বোকা দেখায়!
যাই হোক, সময়ের সাথে সাথে আপনি এগুলো সহ্য করতে শিখে যান; আপনার কাছে তখন আর এর কোনো গুরুত্ব থাকে না। একজন মানুষ মারা গেছে—কিন্তু এতে আপনার কোনো দোষ নেই; আপনি নিয়ম মেনেই তার চিকিৎসা করেছেন। কিন্তু আপনার জন্য এর চেয়েও বড় যন্ত্রণার বিষয় হল যখন কেউ আপনার ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখে, অথচ আপনি নিজে অনুভব করেন যে আপনার কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনার পুরো পরিবারটি আমার ওপর ঠিক এই ধরনের অন্ধ বিশ্বাস রেখেছিল; তারা ভুলেই গিয়েছিল যে তাদের মেয়ে বিপদে আছে। আমি নিজেও তাদের আশ্বস্ত করে বলছিলাম যে ‘কিছু হয়নি’, কিন্তু ইতিমধ্যে ভয়ে আমার নিজের বুক শুকিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের দুর্দশা আরও বাড়াতে রাস্তার অবস্থা এমন ছিল যে কোচম্যান ওষুধ আনার জন্য বের হয়ে পুরো দিন আর ফিরত না। আর আমি কখনোই রোগীর ঘর ছেড়ে যেতাম না; নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে আনতে পারতাম না; আমি তাকে মজার মজার গল্প শোনাতাম, জানেন তো, আর তার সঙ্গে তাস খেলতাম। “আমি রাতে তার পাশে বসে তাকে লক্ষ্য করতাম। বৃদ্ধা মা চোখে জল নিয়ে আমাকে ধন্যবাদ জানাতেন; কিন্তু আমি মনে মনে ভাবতাম, ‘আমি আপনার এই কৃতজ্ঞতার যোগ্য নই।’ আমি আপনার কাছে খোলাখুলি স্বীকার করছি—এখন আর গোপন করার কোনো কারণ নেই—আমি আমার রোগীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আর আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনাও আমাকে খুব পছন্দ করতে শুরু করেছিল; মাঝে মাঝে সে আমি ছাড়া আর কাউকেই তার ঘরে থাকতে দিত না। সে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করল, আমাকে নানা প্রশ্ন করত; আমি কোথায় পড়াশোনা করেছি, কেমন জীবন কাটিয়েছি, আমার আত্মীয়স্বজন কারা, আমি কাদের কাছে যাই। আমি অনুভব করতাম যে তার কথা বলা উচিত নয়; কিন্তু তাকে বারণ করা—দৃঢ়ভাবে বারণ করা, বুঝলেন তো—আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। মাঝে মাঝে আমি দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরতাম এবং নিজেকে প্রশ্ন করতাম, “পাষণ্ড কোথাকার, তুই এ কী করছিস?”… সে আমার হাত টেনে ধরত এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখত, আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত, দীর্ঘশ্বাস ফেলত এবং বলত, ‘আপনি কত ভালো!’ তার হাতগুলো জ্বরে পুড়ছিল, চোখগুলো ছিল বড় বড় এবং ক্লান্ত… ‘হ্যাঁ,’ সে বলত, ‘আপনি একজন ভালো এবং দয়ালু মানুষ; আপনি আমাদের প্রতিবেশীদের মতো নন… না, আপনি তেমন নন… কেন আমি আপনাকে এতদিন চিনতাম না!’ ‘আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা, শান্ত হন,’ আমি বলতাম… ‘বিশ্বাস করুন, আমি অনুভব করছি, জানি না কীভাবে আমি আপনার আস্থা অর্জন করেছি… কিন্তু শান্ত হোন… সব ঠিক হয়ে যাবে; আপনি আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন।’
ইতিমধ্যে আমি আপনাকে বলে রাখি,” ডাক্তার সামনের দিকে ঝুঁকে এবং ভ্রু কুঁচকে বলতে থাকলেন, “যে প্রতিবেশীদের সাথে তাদের মেলামেশা ছিল খুব সামান্য, কারণ সাধারণ মানুষরা তাদের সমপর্যায়ের ছিল না, আর আভিজাত্যের গর্ব তাদের ধনীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে বাধা দিত। আমি আপনাকে বলছি, তারা ছিল এক অসাধারণ মার্জিত পরিবার; তাই তাদের সান্নিধ্য আমার জন্য খুব তৃপ্তিদায়ক ছিল। সে কেবল আমার হাত থেকেই তার ওষুধ খেত… বেচারি মেয়েটি আমার সাহায্যে নিজেকে টেনে তুলত, ওষুধটা নিত এবং আমার দিকে তাকিয়ে থাকত… আমার মনে হতো বুকটা ফেটে যাবে। আর এদিকে তার অবস্থা সময়ের সাথে সাথে খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছিল; সবসময়ই খারাপ হচ্ছিল; আমি মনে মনে ভাবতাম, সে মারা যাবে; তাকে মরতেই হবে। বিশ্বাস করুন, আমি নিজেই বরং কবরে চলে যেতাম; আর এদিকে তার মা এবং বোনেরা আমার দিকে তাকিয়ে থাকত, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে খুঁজত… আর আমার ওপর তাদের সেই বিশ্বাস তিল তিল করে শেষ হয়ে আসছিল। ‘তো, ও কেমন আছে?’ ‘ওহ, সব ঠিক আছে, একদম ঠিক আছে!’ ঠিক আছে বটে! আমার মাথা তখন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল।
একদিন রাতে আমি আবার আমার রোগীর পাশে একা বসে ছিলাম। পরিচারিকাটিও সেখানে বসে ছিল এবং নাক ডেকে বেশ ঘুমাচ্ছিল; আমি অবশ্য সেই বেচারি মেয়েটির কোনো দোষ দিচ্ছিলাম না; সেও খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা সারা সন্ধা ধরেই খুব অসুস্থ বোধ করছিল; তার খুব জ্বর ছিল। মাঝরাত পর্যন্ত সে এপাশ-ওপাশ করছিল; শেষ পর্যন্ত মনে হলো সে ঘুমিয়ে পড়েছে; অন্তত সে স্থির হয়ে শুয়ে ছিল, কোনো নড়াচড়া করছিল না। ঘরের কোণে পবিত্র মূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বলছিল। আমি সেখানে মাথা নিচু করে বসেছিলাম; এমনকি একটু তন্দ্রামতোও এসেছিল। হঠাৎ মনে হলো কেউ আমাকে পাশ থেকে স্পর্শ করল; আমি ঘুরে তাকালাম… হে ঈশ্বর! আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা একাগ্র দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে… তার ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করা, গাল দুটো মনে হচ্ছিল পুড়ে যাচ্ছে। ‘কী হয়েছে?’ ‘ডাক্তার, আমি কি মারা যাব?’ ‘করুণাময় ঈশ্বর!’ ‘না ডাক্তার, না; দয়া করে আমাকে বলবেন না যে আমি বেঁচে থাকব… ও কথা বলবেন না… আপনি যদি জানতেন… শুনুন! ঈশ্বরের দোহাই, আমার আসল অবস্থা আমার কাছে গোপন করবেন না,’ এবং তার নিঃশ্বাস খুব দ্রুত পড়ছিল। ‘আমি যদি নিশ্চিতভাবে জানতে পারি যে আমাকে মরতেই হবে… তবে আমি আপনাকে সব বলে দেব—সব!’
‘আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা, আমি মিনতি করছি!’ ‘শুনুন; আমি মোটেও ঘুমাইনি… আমি দীর্ঘক্ষণ ধরে আপনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম… ঈশ্বরের দোহাই!… আমি আপনাকে বিশ্বাস করি; আপনি একজন ভালো মানুষ, একজন সৎ মানুষ; আমি আপনাকে এই পৃথিবীর পবিত্র সবকিছুর দোহাই দিয়ে অনুরোধ করছি—আমাকে সত্যিটা বলুন! আপনি যদি জানতেন এটা আমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ… ডাক্তার, ঈশ্বরের দোহাই আমাকে বলুন… আমি কি বিপদে আছি?’ ‘আমি আপনাকে কী বলতে পারি, আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা, প্রার্থনা করুন!’ ‘ঈশ্বরের দোহাই, আমি মিনতি করছি!’ ‘আমি আপনার কাছে লুকাব না,’ আমি বললাম, ‘আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা; আপনি অবশ্যই বিপদে আছেন; কিন্তু ঈশ্বর দয়ালু।’ ‘আমি মারা যাব, আমি মারা যাব।’ এবং মনে হল সে এতে খুশি হয়েছে; তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল; আমি আতঙ্কিত হলাম। ‘ভয় পাবেন না, ভয় পাবেন না! আমি মৃত্যুকে একদমই ভয় পাই না।’ সে হঠাৎ উঠে বসল এবং নিজের কুনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকল। ‘এখন… হ্যাঁ, এখন আমি আপনাকে বলতে পারি যে আমি আপনাকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাই… আপনি খুব দয়ালু এবং ভালো—আমি আপনাকে ভালোবাসি!’ আমি আবিষ্টের মতো তার দিকে তাকিয়ে রইলাম; আপনি জানেন, এটা আমার জন্য খুব ভয়ানক ছিল। ‘শুনছেন তো, আমি আপনাকে ভালোবাসি!’ ‘আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা, আমি কীভাবে এর যোগ্য হলাম—’ ‘না, না, আপনি নন—আপনি আমাকে বুঝতে পারছেন না…’ এবং হঠাৎ সে তার দুই হাত বাড়িয়ে আমার মাথা নিজের হাতে টেনে নিল এবং সেখানে চুম্বন করল… বিশ্বাস করুন, আমি প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলাম… আমি হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লাম এবং বালিশের ভেতর নিজের মাথা গুঁজে দিলাম। সে কথা বলছিল না; তার আঙুলগুলো আমার চুলের মধ্যে কাঁপছিল; আমি শুনতে পাচ্ছিলাম সে কাঁদছে। আমি তাকে শান্ত করার, আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছিলাম… আমি সত্যি জানি না আমি তাকে কী বলেছিলাম। ‘পরিচারিকাটি জেগে যাবে,’ আমি তাকে বললাম; ‘আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা, আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাই…’ “আমাকে বিশ্বাস করুন… নিজেকে শান্ত করুন।’ ‘যথেষ্ট হয়েছে, অনেক হয়েছে!’ সে জেদ করতে লাগল; ‘ওদের কথা একদম ভাববেন না; ওদের জাগতে দিন; ওদের ভেতরে আসতে দিন; তাতে কিচ্ছু যায় আসে না; আমি তো মারাই যাচ্ছি, দেখতেই পাচ্ছেন… আর আপনি কিসের ভয় পাচ্ছেন? আপনি কেন ভয় পাচ্ছেন? মাথা তুলুন… অথবা, হতে পারে আপনি আমাকে ভালোবাসেন না; হয়তো আমিই ভুল বুঝছি… যদি তেমনটা হয়, তবে আমাকে ক্ষমা করবেন।’ ‘আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা, আপনি এসব কী বলছেন? আমি আপনাকে ভালোবাসি, আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা।’ সে সোজা আমার চোখের দিকে তাকাল এবং নিজের দুই হাত বাড়িয়ে দিল। ‘তবে আমাকে আপনার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করুন।’
আমি আপনাকে খোলাখুলি বলছি, জানি না কীভাবে আমি সেদিন রাতে পাগল হয়ে যাইনি। আমার মনে হচ্ছিল আমার রোগী নিজেই নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে; আমি বুঝতে পারছিলাম সে পুরোপুরি নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। আমি এও বুঝতে পারছিলাম যে, যদি সে নিজেকে মৃত্যুশয্যায় না ভাবত, তবে কখনোই আমার কথা তার মনে আসত না; আর সত্যিই, আপনি যা-ই বলুন না কেন, ভালোবাসা না জেনে কুড়ি বছর বয়সে মারা যাওয়া বড় কঠিন; এই অভাবটাই তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছিল; এই কারণেই সে হতাশায় আমাকে আঁকড়ে ধরেছিল—আপনি কি এখন বুঝতে পারছেন? সে আমাকে তার দুহাতে জড়িয়ে ধরল এবং কিছুতেই ছাড়তে চাইল না। ‘আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা, আমার ওপর করুণা করুন, আর নিজের ওপরও দয়া করুন,’ আমি বললাম। সে বলল, ‘কেন? চিন্তা করার কী আছে? আপনি তো জানেনই আমাকে মরতে হবে।’… সে অবিরাম এই কথা বলে যাচ্ছিল… ‘যদি আমি জানতাম যে আমি আবার সুস্থ জীবনে ফিরে যাব এবং আবার সেই আগের মতো মার্জিত তরুণী হয়ে উঠব, তবে আমি খুব লজ্জিত হতাম… অবশ্যই, লজ্জিত হতাম… কিন্তু এখন কেন লজ্জিত হব?’ ‘কিন্তু কে বলেছে আপনি মারা যাবেন?’ ‘ওহ, না, আমাকে ছেড়ে দিন! আপনি আমাকে ধোঁকা দিতে পারবেন না; আপনি মিথ্যে বলতে জানেন না—নিজের মুখটা একবার আয়নায় দেখুন।’ ‘আপনি বেঁচে থাকবেন, আলেকজান্দ্রা আন্দ্রেয়েভনা; আমি আপনাকে সারিয়ে তুলব; আমরা আপনার মায়ের আশীর্বাদ নেব… আমরা এক হব—আমরা সুখী হব।’ ‘না, না, আমি আপনার কথা বিশ্বাস করেছি; আমাকে মরতেই হবে… আপনি আমাকে কথা দিয়েছেন… আপনি আমাকে বলেছেন।’…
আমার জন্য দিনটি ছিল বড় নিষ্ঠুর—অনেক কারণেই নিষ্ঠুর। আর দেখুন, কত তুচ্ছ ছোটখাটো বিষয় মাঝে মাঝে ঘটে; সেগুলো হয়তো কিছুই না, কিন্তু বড় বেদনাদায়ক। হঠাৎ তার মনে হল আমাকে আমার নাম জিজ্ঞেস করতে; আমার পদবি নয়, আমার প্রথম নাম। আমার কপাল এতটাই খারাপ ছিল যে আমার নাম ছিল ‘ত্রফোন’। হ্যাঁ, সত্যিই; ‘ত্রফোন ইভানিচ’। বাড়ির সবাই আমাকে ‘ডাক্তার’ বলেই ডাকত। যাই হোক, এর আর কোনো উপায় ছিল না। আমি বললাম, ‘ম্যাডাম, আমার নাম ত্রফোন।’ সে ভ্রু কুঁচকাল, মাথা নাড়ল এবং ফরাসিতে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল—আহ, নিশ্চয়ই অপ্রীতিকর কিছু একটা!—এবং তারপর সে হাসল—সেটা এক অদ্ভুত নিরানন্দ হাসি ছিল। এভাবেই আমি তার সাথে পুরো রাতটা কাটালাম। ভোরের আগে আমি যখন চলে এলাম, তখন আমার মনে হচ্ছিল…যেন আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। যখন আমি আবার তার ঘরে গেলাম, তখন দিন হয়ে গেছে, সকালের চা পানের পর। হে ঈশ্বর! আমি তাকে চিনতেই পারছিলাম না; মানুষ কবরেও এর চেয়ে ভালো অবস্থায় শুয়ে থাকে। আমি আমার সম্মানের কসম খেয়ে বলছি, আমি বুঝতে পারছি না—এখনও বুঝতে পারছি না—কীভাবে আমি সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেঁচে ছিলাম। আরও তিন দিন ও তিন রাত আমার রোগী মৃত্যুর সাথে লড়াই করে টিকে ছিল। আর কী সেই রাতগুলো! সে আমাকে কত কী যে বলেছিল! আর শেষ রাতে—শুধু কল্পনা করুন—আমি তার পাশে বসেছিলাম এবং ঈশ্বরের কাছে কেবল একটি জিনিসের জন্য প্রার্থনা করছিলাম: ‘ওকে নিয়ে নাও,’ আমি বলছিলাম, ‘দ্রুত, এবং আমাকেও ওর সাথে নাও।’
হঠাৎ বৃদ্ধ মা অপ্রত্যাশিতভাবে ঘরে ঢুকলেন। আগের সন্ধ্যায় আমি তাকে বলেছিলাম—সেই মাকে—যে খুব একটা আশা নেই, আর একজন পাদ্রি ডেকে পাঠানোই ভালো হবে। অসুস্থ মেয়েটি যখন তার মাকে দেখল, সে বলল: ‘খুব ভালো হয়েছে তুমি এসেছ; আমাদের দিকে তাকাও, আমরা একে অপরকে ভালোবাসি—আমরা একে অপরকে কথা দিয়েছি।’ আমি বিবর্ণ হয়ে গেলাম। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও কী বলছে ডাক্তার? ও কী বলছে?’ আমি বললাম, ‘ও প্রলাপ বকছে; জ্বরের কারণে এমন বলছে।’ কিন্তু সে বলল: ‘চুপ, চুপ; আপনি তো এইমাত্র আমাকে অন্যরকম কিছু বললেন এবং আমার আংটি নিয়েছেন। কেন আপনি ভান করছেন? আমার মা খুব ভালো—তিনি ক্ষমা করবেন—তিনি বুঝবেন—আর আমি তো মারাই যাচ্ছি। …আমার মিথ্যে বলার কোনো দরকার নেই; আপনার হাত দিন আমাকে।’ আমি লাফিয়ে উঠলাম এবং ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম। বৃদ্ধা মা অবশ্য অনুমান করতে পেরেছিলেন ঘটনাটা আসলে কী।
যাই হোক, আমি আপনাকে আর ক্লান্ত করব না, আর আমার নিজের জন্যও এই স্মৃতিগুলো মনে করা বড় যন্ত্রণাদায়ক। পরদিন আমার রোগী মারা গেল। ঈশ্বর তার আত্মার শান্তি দিন!” ডাক্তার দ্রুত এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করলেন। “মারা যাওয়ার আগে সে তার পরিবারকে বাইরে যেতে বলেছিল এবং আমাকে তার সাথে একা থাকতে বলেছিল।”
‘আমাকে ক্ষমা করবেন,’ সে বলেছিল; ‘হয়তো আপনার প্রতি আমার আচরণের জন্য আমিই দায়ী… আমার অসুস্থতা… কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে ছাড়া আর কাউকেই ভালোবাসিনি… আমাকে ভুলে যাবেন না… আমার আংটিটা নিজের কাছে রাখবেন।’
ডাক্তার মুখ ফিরিয়ে নিলেন; আমি তার হাত ধরলাম।
“আহ!” তিনি বললেন, “চলুন আমরা অন্য কিছু নিয়ে কথা বলি, নাকি আপনি সামান্য বাজিতে ‘প্রেফারেন্স’ খেলতে পছন্দ করবেন? আমাদের মতো মানুষের পক্ষে উচ্চতর আবেগের কাছে নতি স্বীকার করা সাজে না। আমার এখন একটাই চিন্তা; বাচ্চাদের কান্না থামানো আর বউয়ের বকুনি থেকে বাঁচার উপায় বের করা। কারণ, আপনি জানেন তো, এরপর আমি আইনসম্মতভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি… ওহ… আমি এক বণিকের মেয়েকে বিয়ে করেছি—যৌতুক হিসেবে সাত হাজার রুবল পেয়েছিলাম। তার নাম আকুলিনা; ত্রফোনের সাথে নামটা বেশ মানায়। সে বড় বদরাগী এক মহিলা, আপনাকে সত্যি বলছি, তবে ভাগ্য ভালো যে সে সারাদিনই ঘুমিয়ে কাটায়… তো, এখন কি এক হাত ‘প্রেফারেন্স’ হবে?”
আমরা আধ-পেনি পয়েন্টের বাজিতে তাস খেলতে বসলাম। ত্রফোন ইভানিচ আমার কাছ থেকে আড়াই রুবল জিতে নিলেন এবং নিজের এই সাফল্যে বেশ সন্তুষ্ট চিত্তে অনেক রাতে বাড়ি ফিরে গেলেন।
