রন্ধন-বন্ধন
অর্পিতা বোস
১
ভোরবেলায় বিছানা ত্যাগ সুপান্থের সেই ছোটবেলার অভ্যাস। মায়ের জীবনযাপনের প্রভাব সুপান্থের জীবনে গভীরভাবে লক্ষিত। কখনও ইচ্ছে হয়নি ব্যতিক্রম ঘটাতে। দোতলার এই ছোট একাকী সংসারে প্রাচুর্যের আতিশয্য না থাকলেও পরিচ্ছন্নতার ছাপ মায়ের ছায়া রাখে। বিছানা ছেড়েই বিছানা পরিপাটি করার স্বভাব বহুপুরোনো। গতকাল রাতেই বের করে রাখা বিছানার চাদর, বালিশের ওয়ার বদলে ফেলল। সবসময়ই মাকে দেখেছে পরেরদিনের কাজ আগের রাতে গুছিয়ে রাখতে।
মা অজানা ঠিকানায় হারিয়ে যাওয়ার পর একাকী সময় পুরো বাড়িটা তখন যেন সুপান্থকে গিলে খেতে আসত। তখনই একদিন অফিসে নতুন বদলী হয়ে আসা মিহিরদার সাথে কথা হয়। মিহিরদা সস্ত্রীক এখানে থাকার জন্য ভালো ঘর খুঁজছিলেন। ব্যস আর কী! সুপান্থের এই বাড়ির একতলা জুড়ে এখন মিহিরদার সংসার। ভাড়াটিয়া-মালিকের সম্পর্কের সীমা অতিক্রম করে এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মিহিরদার স্ত্রী কুমকুম বৌদি সুপান্থকে ভীষণ স্নেহ করেন। তবে হঠাৎই গত পরশু কুমকুম বৌদি আবদার করেন আজ রবিবার বিকেলে চায়ের সাথে সুপান্থের হাতে তৈরি ফিশফ্রাই খাওয়ার। রবিবার ছুটির দিন বিকেলটা এমনিও সুপান্থর একা লাগে ছুটির দিনগুলোতে তাই রাজিই হয়ে গেল ওর বারান্দাবাগানে চায়ের আড্ডার।
২
টুকিটাকি কাজ সেরে বাজারের থলেটা নিয়ে বেরোলো। ভেটকির ফিলেটগুলো আলাদা করে নিয়ে ফেরার পথে চোখে পড়ল এক বয়স্কা মহিলার কাছে অনেক সর্ষে ফুল। এবছর আর টবে সর্ষেদানা ফেলা হয়নি। দু-গোছা ফুল কিনে নিল। আরও টুকিটাকি কেনাকাটা সেরে বাড়ির পথে তাড়াতাড়ি রওনা হল।
৩
সকালের জলখাবারের পর্ব মিটতেই ধোয়া মাছগুলো নামিয়ে নিল। “রান্না একটা শিল্প” মা বলতেন। মায়ের থেকেই এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ সুপান্থের।
কাঁচা মাছের গন্ধ এড়াতে ও মাছ নরম করতে ভেটকির ফিলেটগুলোতে গোলমরিচের গুঁড়ো, লবণ আর পাতিলেবুর রসে সম্পূর্ণ মিশিয়ে রেফ্রিজারেটরে তুলে রাখল। এরপর হাত ধুয়ে দুটো ফুলদানিতে জল দিয়ে সর্ষে ফুল সাজিয়ে রাখল। তারপর চলে গেল ঘরের লাগোয়া বারান্দায়। সামনের এই বারান্দাটা বেশ ভালো আয়তনের। মায়ের বড়ো পছন্দের ছিল এই বারান্দাটা। ছোট বড়ো নানা আকারের অনেক টব। ফুল, নানান সবজি আর কিছু পছন্দের শাকপাতায় সাজানো এই বারান্দাটা এক আলাদা মাত্রা যোগ করে সুপান্থর এই দোতলার একাকী সংসারে। নিজের হাতে পরিচর্যা করে বাগানের। মায়ের পরশ খুঁজে পায় যেন পাতা ফুলের মাঝে। যদিও আজ ছুটির দিন তবে আজ অনেক কাজ পড়ে আছে। তাই দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সুপান্থ পুদিনা আর ধনেপাতার টবের দিকে। পুদিনাপাতাগুলো টব ছাড়িয়ে মাটিতে লুটিয়ে থাকে। পুদিনাপাতা তুলে নেয় সেইসাথে তুলে নেয় টবে হয়ে থাকা ধনেপাতাও। এই নানারকম গাছ লাগানোর শখটাও মায়ের থেকেই শিরায় ধাবিত। যদিও নিজের হাতে লাগানো পুদিনা, ধনেপাতা কীটনাশকবিহীন। তবুও ধুয়ে পরিষ্কার করে নেয়। মায়ের বিশেষ পছন্দ ছিল মশলা শিলনোড়ায় বেটে নেওয়া। মা বলতেন দেশের ভাষায় “পাটাপুতা”। সুপান্থর খুব ভালো লাগত এই শব্দটা। তবে পরবর্তী সময় পাটাপুতার সাথে সাথে মিক্সিও ব্যবহার করতেন মা। সুপান্থ বেশিরভাগ সময় মিক্সিই ব্যবহার করে।
মিক্সির জারে পুদিনাপাতা, ধনেপাতার সাথে আদা কুচি, পেঁয়াজ কুচি, ছাড়ানো রসুন, লঙ্কা আর অল্প চিনি ও লবন দিয়ে বেটে নিল। তারপর এই মিশ্রণ একটা বড়োপাত্রে ঢেলে তাতে একটা ডিম ভেঙে আর কর্ণফ্লাওয়ার মিশিয়ে নিল। এবার রেফ্রিজারেটরে রাখা গোলমরিচের গুঁড়ো, লবন আর পাতিলেবুর রসে মাখানো ভেটকির প্রতিটা ফিলেটে এই মিশ্রণ সুন্দর করে মাখিয়ে আবারও রেফ্রিজারেটরে তুলে রাখল, সুস্বাদু করার জন্য।
ঠিক তখনই বাইরের গাছটার ডালে কোকিলের ডাক শুনে আপন মনে গুনগুনকরে ওঠে সুপান্থ,
“কার পদ-পরশন আশা,
তৃণে তৃণে অর্পিল ভাষা…”
সুরের সাথেই দুপুরের রান্নার আয়োজন করতে এগোয়।
৪
দুপুরের রান্না খাওয়া সব শেষ হতে প্রায় ঘন্টা দুয়েক চলে গেল। এবার ফিশফ্রাইয়ের ম্যারিনেট করা ফিলেটগুলো বেঁধে তৈরি করে রাখবে। যাতে বিকেলে শুধু ভেজে নিলেই চায়ের আসর জমে যায়।
একটা থালায় বিস্কুট গুঁড়ো ছড়িয়ে রাখে আর একটা পাত্রে ডিম ভেঙে তাতে আন্দাজমতো লবণ আর গোলমরিচ দিয়ে ফেটিয়ে নেয়।
এবার রেফ্রিজারেটর থেকে ম্যারিনেট করা ভেটকির ফিলেটগুলোকে ডিমের মিশ্রণে চুবিয়ে বিস্কুটের গুঁড়ো দিয়ে প্রলেপ করে। সুন্দর আয়তাকার একটা থালায় পরপর সাজিয়ে রেফ্রিজারেটরে তুলে রাখে বিকেলে ভাজার জন্য।
৫
মিহিরদারা আজ বিকেলে চায়ের আসরে এক বিশেষ চমক নিয়ে এলেন। দরজা খুলতেই দেখে দাদা-বৌদির সাথে আরেকজন অপরিচিত অতিথি। আলাপ করিয়ে দেন বৌদিই।
– আমার মাসতুতোবোন মণিকাকে নিয়ে এলাম। তোমার ফিশফ্রাই কম পড়বে নাতো?
বৌদির চোখে মুখে যেন কিসের ইঙ্গিত। হেসে ফেলে সুপান্থ – মোটেই না।
৬
-সর্ষেফুলটা এভাবে সাজানো যায় জানতাম না। মণিকার কথার উত্তরে স্মিত হাসে সুপান্থ। মণিকা কিন্তু বলেই চলে, দিদির কাছে শুনেছিলাম আপনার রান্নার গল্প। তাই…
– তাই?
কথার রেশ ধরেই মণিকার চোখে চোখ রাখে। চোখ নামিয়ে মণিকা বলে,
ফিশফ্রাইটা খুব ভালো লাগল।
আর শেফকে?
আরও কয়েকবার ফিশফ্রাই খেলে বুঝতে পারব।
দুজনের একসাথে হাসি শুনে বারান্দায় বসা কুমকুমবৌদি মুচকি হাসে। মিহিরদা তখন ফিশফ্রাইয়ের স্বাদে মশগুল।
থালায় রাখা বাকি ফিশফ্রাইগুলো কিসের যেন অপেক্ষায় থাকে।
