short-story-holud-bhul

হলুদ ভুল
জয়তী রায়


দশতলায় ফ্ল্যাট। চারদিক খোলা। বিশাল ঘরগুলির সঙ্গে মানানসই চওড়া বারান্দা জুড়ে গাছের টবে উছলে পড়ে আলো, লুটোপুটি বাতাস, অকৃপণ বারিধারা। তবু, গাছের পাতা অসুখী, বিবর্ণ, হলুদ। ধাক্কা লাগে চোখে ও মনে। এমন কেন হচ্ছে? জল দেওয়া হচ্ছে। যত্ন করছে। তবু হলুদপাতা? কোথাও ভুল হচ্ছে? মাপের? হিসেবের? ওষুধ, সার, মাটি …হিসেবমতো দিতে হবে তো সব! ভুল করলেই বিশ্রী কুৎসিত। কেটে ফেলতে হবে বিবর্ণ পাতা। কে না জানে, নোংরা বিচ্ছিরি কোনও জিনিসের ঠাঁই নেই এই বাড়িতে! অমিতার বাড়িতে।

নিমেষ থমকে চন্দনধূপের স্ট্যান্ড নিয়ে বসিয়ে দিল নটরাজ মূর্তির সামনে। ভোরবেলাকার অভ্যাস করতে হবে বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী অমিতা গোস্বামীর। অভ্যাস কক্ষের চারিদিকের আয়নায় প্রতিফলিত উজ্জ্বল অমিতা। বয়স? সে কেবল কাগজে কলমে। মসৃণ শরীরে টোল নেই, চোখের কোনে কাকের পা নেই, সোনালি পালিশ ত্বক। আয়নায় নিজেকে দেখে তৃপ্ত অমিতা আর একদিকের দেওয়ালে সুন্দর করে সাজানো নিজের মায়ের ছবির দিকে দেখে। অহংকারি গর্বিত চোখ সোজা তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। সফল স্বপ্নকে যেন অনুভব করছে মরণের ওপার থেকে। মায়ের সার্থক মেয়ে। জীবন মানেই সাফল্য। সেখানে বরদাস্ত হবে না কোনও বাধা। মা আদর্শ। মায়ের ছবিতে প্রণাম করে মিহি কিন্তু ছুরির মত তীক্ষ্ণ গলায় আদেশ দিল অমিতা, ‘হলুদপাতা কেটে পরিষ্কার সাজিয়ে তোলো বারান্দা।’

পরিচারিকা নীরবে চলে যেতে চন্দন সুবাসে ভরে উঠল বিশাল ফ্ল্যাটের অলিগলি। বেজে উঠল তবলার বোল। সুরলোকের অপ্সরীর মত সাধনায় মগ্ন হল অমিতা।

‘ম্যাডাম আপনার তো একটিই ছেলে?’

সাক্ষাৎকার চলছে। বিখ্যাত সংবাদপত্রের সাংবাদিক এসেছে বাড়িতে। সঙ্গের ফটোগ্রাফার যুবক নরম গালিচায় পা মুড়ে বসে থাকা অমিতার ছবি নানান দিক থেকে নিচ্ছে এবং চোখে ফুটে উঠছে পুরুষদৃষ্টির আরতি। অমিতা উপভোগ করে। স্তুতি, বিশেষ করে পুরুষের, সুদর্শন সুপুরুষ হলে উপভোগ না করার কোনও কারণ নেই। রূপের শুধু নয় …গুণের, কাজের, গৃহসজ্জার, রুচির মুগ্ধ পুরুষ নারী দুই-ই। তবে, রিপোর্টার তো রিপোর্টার। তাদের চোখে অনন্ত জিজ্ঞাসা। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জিজ্ঞাসার অন্ত নেই। অমিতাকে নিয়ে গুঞ্জন কম নয়। নাচ এবং পুরুষ দুটোই যার জীবনে অপরিহার্য তাকে নিয়ে কথা হবে না, এমন হয় না কি? যথারীতি হুল ফোটানো প্রশ্ন করে চলেছে অল্পবয়েসী মেয়েটি। কী যেন নাম? তৃষা! চটপট স্মার্ট। উঁচু করে বাঁধা চুলের নিচে তীক্ষ্ণ দুটি চোখ। চাপা চোয়ালে কঠিন ভাব। বয়স অল্প হলেও মেয়েটা বুদ্ধিমতী। মুখের ভাব গোপন করে পেশাদারী হাসি ফুটিয়ে তুলল মুখে অমিতা ‘হ্যাঁ। একটাই সন্তান। মনিপালে ডাক্তারী পড়ছে। অর্থোপেডিক। ওর বাবার সেটাই ইচ্ছে।’

‘অর্থোপেডিক? আচ্ছা! একদিকে ভালো। গুরুজির তো পায়ের প্রবলেম, তাই না? ছেলে ডাক্তার হলে অনেক সুবিধা। কেমন আছেন গুরুজি?’

‘এখন অনেক ভালো। শিগগি রই আমার সঙ্গে মঞ্চে উঠবেন।’

‘বাঃ! এটা তো দারুণ খবর ম্যাডাম।’

আন্তরিক স্বরে থেমে থেমে বলে তৃষা, ‘আমার মা ছিল স্যারের ছাত্রী। আপনার সঙ্গেই, চিনবেন হয়তো।’

‘কী নাম?’

‘শ্বেতা। শ্বেতা রায়চৌধুরী।’

জ্বলন্ত লোহার শলাকার মত নামটা কানে ঢুকল অমিতার। শ্বেতার মেয়ে তৃষা? আচমকা ঝড় ঢুকে পড়তে চাইল মনের ভিতর ঘরে। তছনছ করে দিতে চাইল সযতনে লুকিয়ে রাখা নির্মম সত্য! নিজেকে সামলে নিয়ে তাল লয়ে ঝটাকসে ফিরে এসে নিখুঁত উদাসীন গলায় বলে অমিতা, ‘মনে পড়ছে না ঠিক …এখন কী করেন তোমার মা?’

‘কিছু না। বাড়িতেই থাকে। গুরুজীর ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার পরে মা আর পায়ে ঘুঙুর পরেনি। আপনার মনে নেই? মায়ের খুব মনে আছে আপনাকে।’

‘গুরু ব্রজকুমারের কাছে কত জন তালিম নিত। মনে রাখার মত বিখ্যাত কি তোমার মা?’

ইচ্ছে করে হুল ফুঁটিয়ে দিল অমৃতা। জ্বলে পুড়ে মরুক।

হিসহিস করে জবাব দিল তৃষা, ‘প্রতিভা ছিল, লোভ ছিল না। ওইখানে হেরে গেল মা।’

বিষ চোখে তাকায় অমৃতা। তৃষার সঙ্গে একটুও মিল নেই শ্বেতার। এই মেয়ে কটকট খটখট আর সে ছিল জুঁইফুলের মত সুন্দর। নরম। তেমনই ছিল পায়ের কাজ। অভ্যাসকক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাধনা চলত গুরু শিষ্যার। অমৃতা জোর করে ঢুকে গিয়ে চিৎকার করত, ‘তুমি আমার হাসব্যান্ড। ভুলে যেও না। আমাকে না শিখিয়ে কেবল শ্বেতা? কে-ন-ও-ও?’

বিখ্যাত কত্থক গুরু ব্রজকুমার বরফ গলায় উত্তর দিত, ‘স্ত্রী হলেই প্রধান শিষ্যা হওয়া যায় না। তার জন্য যোগ্যতা দরকার।’

‘যোগ্যতা! তুমি আমাকে যোগ্যতা শেখাচ্ছ? কোন মায়ের মেয়ে আমি জানো না?’

‘ওইটে ত্যাগ করে এসো। মায়ের খ্যাতির খোলস ত্যাগ করে শান্ত শিক্ষার্থীর ভাব মনে বসিয়ে এসো, তবে কিছু শিখবে।’

‘আমি সব বুঝি। নোংরা সম্পর্ক তোমাদের। প্রেস ডেকে বলে দেব তোমার আসল রূপ? পাবলিক মাথায় তুলে রাখে যাকে, যার প্রোগ্রামে টিকিট পাওয়া যায় না সে কেমন মানুষ?’

মাছি তাড়ানোর মত উপেক্ষা আর অবজ্ঞার ভঙ্গি করে পাখোয়াজে বোল তুলে সোজা তাকাতেন প্রিয় শিষ্যার দিকে ‘মাতা যশোদার গল্প জানো শ্বেতা? কত্থক মানে কথ, কথা, গল্প। কথাকার – যে গল্প বলে। তুমি ভালো করে গল্পটা আগে জেনে নাও। ফুটিয়ে তুলতে হবে ওই মায়ের সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্ক। কপট রাগ। অভিমান। লীলা।’

অমিতা দেখত সে কোথাও নেই। মঞ্চে নেই। বিজ্ঞাপনে নেই। বিদেশযাত্রার সঙ্গী হিসেবে নেই। শ্বেতা ছিল প্রধান। সেদিন দুর্ঘটনা ঘটলে আহত পাখির মত ডুকরে কাঁদছিল শ্বেতা। দিনের পর দিন বসে থাকত নার্সিংহোমে। কত বদনাম কত লেখালিখি …শ্বেতা একটুও টলেনি। নিজের পা কেটে গুরুর পায়ে বসিয়ে দিলে তবে যেন শান্তি পেত মেয়েটা!

অমিতা শুনল তৃষা বলছে, ‘ম্যাডাম, আপনার মায়ের কথা বলুন। জানকী দেবীর কথা। বিখ্যাত মায়ের কন্যা আপনি।’

সঠিক প্রশ্ন। মায়ের কথা হোক। উজ্জ্বল সবুজ জীবনের কথা হোক। তার বাবা অথবা স্বামীর কথা না তুললেই ভালো। মা পথিকৃৎ। অপ্রয়োজনীয় জীর্ণ জীবন ছেঁটে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ, এই রাস্তা দেখিয়েছিল মা। যৌথপরিবার ছেড়ে, বাবাকে ছেড়ে বেরিয়ে না এলে আজ কোথায় থাকত মায়ের খ্যাতি? রান্নাঘরের গ্যাসের উনুনে বিসর্জন দিতে হত সমস্ত প্রতিভা। মা শিখিয়েছিলেন বাধা সরিয়ে ফেলতে হবে। না হলে কেউ তোকে পথ খুলে দেবে না রে। আহ্! হোক মায়ের কথা হোক। সাফল্যের কথা হোক। হারিয়ে যাওয়া শ্বেতার কথা না বলাই ভালো।

হেসে উঠে অমিতা বলে, ‘সেই ভালো। মা আমার প্রথম গুরু। প্রচন্ড অধ্যাবসায় আর জেদ, মা একদিন হয়ে উঠলেন নামী নৃত্যশিল্পী। নিজের স্কুল শুরু করলেন। সেখানেই আলাপ হয় ব্রজকুমারের সঙ্গে। সে ছিল মায়ের নৃত্যসঙ্গী। বয়সের তফাৎ ছিল আমাদের। কিন্তু, প্রেম? তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল সব। বিয়ের পরে তালিম দিয়েছেন স্বামী।’

তৃষা কি মুচকি হাসল একটু? মুখ নামিয়ে প্রশ্ন করল, ‘দক্ষ হতে গেলে কতক্ষণ করতে হয় অভ্যাস? আপনার উপদেশ শুনলে উপকৃত হবে অনেকে।’

‘যতক্ষণ মন চায়। অভ্যাস তো করতেই হবে।’

তৃষা কি লুকিয়ে হাসছে? মনের ভুল? শ্বেতা হয়ত বলে দিয়েছে মেয়েকে, অমিতা প্র্যাকটিস করতে চাইত না। অহঙ্কার ছিল। মা নৃত্যশিল্পী বলে লিডরোলে ওর অধিকার এমনটাই ভেবে নিয়েছিল সে। সময় নষ্ট করে হুল্লোড় করত, বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করত। প্রচন্ড রেগে বকুনি দিত ব্রজকুমার, ‘নাচ কি ছেলেখেলা? তোমার যা খুশি তাই করবে?’

সাক্ষাৎকার শেষ। গুটিয়ে পাটিয়ে বিদায় নিচ্ছে সবাই। চোরা চোখে অমিতা দেখল, তৃষা বারবার ভিতর ঘরের দিকে দেখছে। এরপর থেকে সাবধান হতে হবে। বাড়িতে আর কখনও সাংবাদিক ডাকা যাবে না। দশবছর আগের ঘটনাকে মৃত ভেবে অবহেলা করলে চলবে না। কোথায় লুকিয়ে থাকে ঘটনার বীজ কে জানে? সামনেই বিদেশ যাত্রা। আরও নাম আরও টাকা আরও আলো। বাইরের পোকামাকড়ের উৎপাত সহ্য করার বান্দা অমিতা নয়।

নিজেকে সামলে নিয়ে অমিতা ভিতরের ঘরের দিকে চলল। ধপধপে বিছানায় শুকনো শরীর। ব্রজকুমার। এক সময় যার পায়ের ছন্দে মেতে উঠেছিল সমস্ত দেশ …আজ সেই পা অকেজো। শুকিয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছিল অবশ্য, কিছু বিরল জটিল অপারেশন ভালো করে তুলতে পারে। চান্স আছে। অমিতা গুরুত্ব দেয়নি। আয়া আছে, ওইটুকুই। খুব দরকার না হলে ঘেঁষে না এদিকে। বিছানায় পটি করছে একটা লোক …মা গো!

ঝিমন্ত আয়ার দিকে একপলক তাকিয়ে হিসহিস করে বলল অমিতা, ‘এত গন্ধ কেন?’

‘পরিষ্কার করার আগেই ছোড়দার ফোন এলো’ কাঁচুমাচু মুখ আয়ার।

‘কার ফোন?’ তীব্র স্বরে জিজ্ঞেস করে অমিতা।

‘ছোড়দা।’ ছেলের ফোন এলে স্যার আমাকে এখানে থাকতে দেন না ম্যাডাম।

স্তব্ধ অমিতা। এই এক ছেলে! পেটে ধরেছিল মনে হয় না। দূরত্ব বেড়েই চলেছে তার সঙ্গে। পক্ষীমাতার মত নজর বাবার দিকে। সর্বক্ষণ আগলে রাখে। অথচ কত আর বয়স ছিল রাতুলের? দশ? কী করে সে বোঝে সব? অবোধ চোখে কী করে ফুটে ওঠে ঘৃণা? যে ঘৃণা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে! অদ্ভুত! বাবার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলবে, সেখানে কেউ থাকতে পারবে না তখন! কিসের কথা? কিসের পরিকল্পনা? কিসের চক্রান্ত? দশবছর আগে নিজের হাতে ব্রজকুমারের মঞ্চের তক্তার স্ক্রু খুলে না ফেলে দিলে আজ এখানে পৌঁছতে পারত অমিতা? সেকেন্ড লিড নৃত্যশিল্পী হয়ে কেটে যেত জীবন শ্বেতার চরণতলে! যা করেছে বেশ করেছে। আজ থাকুক ব্রজকুমার বিছানায় শুয়ে, হারিয়ে যাক শ্বেতার মত প্রতিভা। অমিতা এতটুকু লজ্জা পায় না। তবু কেন এমন মনখারাপ? কেন মনে হচ্ছে হেরে যাচ্ছে? বারবার চোখের সামনে তৃষার বিদ্রূপে বেঁকে যাওয়া ঠোঁট উঠছে ভেসে! সমস্ত তাল আজ বেতাল, পা যেন ছন্দে নেই। কেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে একমাত্র সন্তানের জেদী টেপা ঠোঁট। বাবাকে ভালো করে তোলার দুর্দম পণ করে ডাক্তারি পড়ছে। রাতুল সন্দেহ করে? রাতুল চেষ্টা করছে সত্য জানার!

অমিতা ক্লান্ত পায়ে বারান্দার দিকে যায়। সেখানে চলছে টব পরিষ্কারের কাজ। পরিচারিকার ধারালো কাঁচির সামনে মৃত শুকনো পাতার আড়াল সরে গিয়ে জেগে উঠেছে স্পর্ধিত তরুণ সবুজ, দর্পিত চরণে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে সমস্ত হলুদ চক্রান্ত।

এই পৃষ্ঠাটি লাইক এবং শেয়ার করতে নিচে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *