short-story-sonali-danar-chil

সোনালি ডানার চিল
রেহান কৌশিক

মাঝবয়সি পাখি। গতকাল সন্ধেয় এসে বসেছে। ঘরের হাওয়া চলাচলের খোপের জাফরি ভাঙা। ফলে সুবিধে হয়েছে। অল্পসল্প হলেও ডানা নাড়ানো যাচ্ছে। যদিও নিজের সুবিধে-অসুবিধে এখন তুচ্ছ। সে নির্নিমেষে তাকিয়ে রয়েছে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মানুষটির দিকে। শ্যামবর্ণ মানুষটির প্রায় সমস্ত শরীর সাদা। ব্যান্ডেজ জড়ানো। মুখের কিছু অংশ ফোলা। বিকৃত দেখাচ্ছে।

কিছুক্ষণ আগে কথা হয়েছে, এখন ঘুমোচ্ছে। নার্স ইঞ্জেকশন দিয়ে গেছে। পাখিটা নিজের দুপায়ের মাঝে মাথা গোঁজে। কিছু পরে মুখ তুলে তাকায়। নাহ্‌, এখনও ঘুম ভাঙেনি।

জাফরির ফাঁক দিয়ে তাকাল বাইরে। আশ্বিন শেষের আকাশে সূর্যাস্তের কমলা রং। নীচের রাস্তায় মানুষের সাধারণ চলাচল। বেশিরভাগই অফিস-ফেরত। একজন বেলুনওয়ালা রংবেরংয়ের  ফোলানো বেলুনের দণ্ড কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এই দু-নাম্বার ওয়ার্ডে সবসময় চাপা কথাবার্তার আওয়াজ। ডাক্তার, রোগী, নার্স, রোগীর আত্মীয়স্বজনদের। সবচেয়ে বেশি ঝামেলা করছে এক খুনের আসামি। মাঝে মাঝেই চিৎকার করে ওয়ার্ড মাথায় তুলছে। তার অস্ত্রোপচার হয়েছে। দুজন সেপাই পাহারায় আছে। সামান্য কোলাহল বাড়ল। এক নতুন রোগীর সঙ্গে বাড়ির লোকজনও এসে ওয়ার্ডে ঢুকেছে। তারই ফাঁক গলে হন্তদন্ত হয়ে এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন ব্যান্ডেজ জড়ানো মানুষটির বিছানার কাছে। চোখে-মুখে গভীর আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। ভদ্রলোক আলতো করে হাত দিয়ে ছুঁলেন শায়িত মানুষটির হাত। মানুষটির আধবোজা চোখ ক্রমশ খুলল। ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন, “কেমন আছেন?”

পাখি দেখল, মৃদু হাসি খেলা করল মানুষটির শুকনো ঠোঁটে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “কমলা খেতে ইচ্ছে করছে, সঞ্জয়।”

“এক্ষুনি ব্যবস্থা করছি। তার আগে ডাক্তারবাবুর কাছে জেনে নিই, কমলা দেওয়া যাবে কিনা।”

মানুষটির শিথিল মুঠোর ভিতর সঞ্জয়ের হাত। মৃদুভাবে বলল, “নতুন কিছু লিখেছ, সঞ্জয়?”

পাখির অভিমান হল। এই মানুষ কি লেখা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না! উরু ভেঙেছে, পাঁজর ভেঙেছে, কন্ঠের হাড়ে গুরুতর চিড়। এমন অবস্থায় শুয়েও লেখার কথা!

ওয়ার্ডের দুই প্রান্তে দুটো বাল্‌ব ঝুলছে। ঘোলাটে হলুদ আলো ছড়িয়ে আছে অসুস্থ মানুষজনের ওপর। কিছুক্ষণ ছাড়া একজন নার্স ওয়ার্ডের এ-মাথা ও-মাথা পায়চারি করে ফিরে যাচ্ছে ডিউটি টেবিলে।

ব্যান্ডেজ জড়ানো মানুষটির চোখে এখন ঘুম নেই। পাখি জানতে চাইল, “কেমন লাগছে এখন?”

মানুষটি পাখির চোখের দিকে স্থির চোখে তাকাল। তারপর বলল, “আর শাস্তি দিয়ো না। এভাবে থাকতে পারছি না। আমাকে নিয়ে চলো…”

“সময়কে তোমার চেয়ে কে বেশি চেনে? সমস্ত ঘটন-অঘটন চলমান এবং পরিব্যাপ্ত সময়ের যে নির্ধারিত সংলাপ, তা তোমার চেয়ে কে বেশি জানে? এই অস্থিরতা তোমাকে মানায়, বলো?” মৃদু-স্বরে কথাগুলো বলার সময় পাখিটাকে কি উদাসীন দেখাল? কে জানে!

সকাল হতেই আর-এক ভদ্রলোক বিছানার কাছে এলেন। মানুষটি জেগে। চোখের মণি হলুদাভ, ঘোলাটে। ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন, “আজ কেমন বোধ করছেন?”

“ভূমেন্দ্র, এখানে থাকতে ভালো লাগছে না। কবে আবার উঠব, বলো তো?”

উত্তর অজানা ভূমেন্দ্রের। তবু মিথ্যে সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বললেন, “খুব শিগগির। যেহেতু আপনার ডায়াবেটিস আছে, রক্ত পরীক্ষা করা খুব জরুরি। এই হাসপাতালে রাত্রিতে রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় করা যায়নি, আজ হবে। সজনীকান্ত ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়কে অনুরোধ করেছেন, উনি আপনাকে দেখে যাবেন। একদম দুশ্চিন্তা করবেন না।”

কথার ফাঁকে সঞ্জয়ও এসে হাজির হলেন। সঞ্জয়কে দেখে বললেন, “প্রেমেন আসেনি?”

“হ্যাঁ, আসবেন।”

কিছুটা নিশ্চিন্ত দেখাল মানুষটিকে। ভূমেন্দ্র সঞ্জয়কে জিগ্যেস করলেন, “তুমি প্রেমেন্দ্র মিত্রকে কখন খবর দিলে?”

“সকালে। উনি খবরটা জেনে ভীষণ উদ্বিগ্ন। তাড়াতাড়ি আসবেন বললেন।”

বিছানায় শায়িত মানুষটি বললেন, “ভূমেন্দ্র, আমার তো রেডিয়োতে কবিতা পড়ার কথা, আমাকে যে যেতে হবে।”

ভূমেন্দ্র এবং সঞ্জয় পরস্পরের দিকে নিঃশব্দে তাকালেন। ভূমেন্দ্র বললেন, “গতকালই তো রেডিয়োতে মহাজিজ্ঞাসা কবিতাটা পাঠ করেছেন। ভুলে গেছেন?”

মানুষটি চুপ করে গেল। কিছু পরে সঞ্জয় এবং ভূমেন্দ্র ওয়ার্ড ছেড়ে বেরিয়ে গেলে পাখিটা বলল, “একটু আগে তুমি আমাকে নিয়ে যেতে বললে, আবার ওই ভূমেন্দ্রের সঙ্গে দেখা হতে, তাকেও এই বিছানা ছেড়ে উঠে যাওয়ার কথা বললে, কী ব্যাপার বলো তো!”

মানুষটি ধীরে ধীরে বলল, “চোখের সামনে দুটো জগৎ ডুমুর পাতায় কিনারায় মাঘ-রাত্রির দু-ফোঁটা হিমের মতো ঝুলে আছে। আঙুল দিয়ে কোন্‌ হিমবিন্দুটি স্পর্শ করব বুঝে উঠতে পারছি না যে!”

“এ-জীবন তোমাকে মূল্য দেয়নি, কবি। ঘরের সম্পর্ক তোমার শরীর ছুঁয়েছে, অন্তর্গত আত্মাকে স্পর্শ করতে চায়নি। বাইরের সম্পর্ক তোমাকে এতদিন অনুকম্পার দৃষ্টিতে দেখেছে। তোমার চিন্তার ঐশ্বর্যের মূল্য দেয়নি। শুকনো পাতার মতো, পথের শাবক ধুলোর মতো এলোমেলো হাওয়ায় কেবল উড়েছ মফসস্‌ল থেকে শহর, ওপারের দেশ থেকে এ দেশে! মাঝে এখন বিভাজনের করুণ কাঁটাতার। কেন, এরপরও তুমি ফিরে যেতে চাও জনকোলাহলে? ভিড়ে? অসহজ সম্পর্কের দিকে?

কোথায় যাবে? কোন্‌ ভূমিতে গিয়ে দাঁড়াবে? ল্যান্সডাউনের ভাড়াবাড়িতে? নাকি, পূর্ব পাকিস্তানের বরিশালে, তোমার জন্মভিটেয়? কে আছে তোমার এই মহাপৃথিবীতে?” পাখিটা এই প্রথম শায়িত মানুষটিকে কবি বলে সম্মোধন করল।

কবি কিছুক্ষণ ভাবল। মনে হল—এই চিল অসত্য কিছুই বলেনি। নিজেকে ভাসমান বরফখণ্ডের মতো মনে হচ্ছে। শীতল জলের ওপর সে একা, চূড়ান্ত একাকিত্ব নিয়ে ভেসে আছে। চিল এই মুহূর্তে তার অন্তরে দীর্ঘকাল ধরে স্তরে স্তরে জমতে থাকা হিম-শীতলতা, যা ক্রমশ পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে, সেই পাথরে স্নেহময় আঘাত হেনেছে। চোখের সামনে দুটো মুখ ছবির মতো ভেসে উঠল—বাবা সত্যানন্দ এবং মা কুসুমকুমারীর। ভাবল—ওঁরা কি কখনও তাকে এমন বকুনি দিয়েছেন? নাহ্‌, মনে পড়ল না। কবি বলল, “আমার যে এখনও অনেক কথা বলার আছে…”

পাখি খুব শান্ত স্বরে কৈফিয়ত চাইল, “কার সঙ্গে? মুখোমুখি বসার মতো কে আছে তোমার?”

কবি চুপ করে গেল। পাখি বলল, “যা বলেছ, কজন তোমার সেসব কথা জানে? যত কথা লিখেছ, সে তো কেবল নিজেকেই শুনিয়েছ একান্তে দুপুরে রৌদ্রের কাছে, গোধূলি ডিঙোনো ছায়াছন্ন সন্ধের কাছে, অন্ধকারে আকাশভরা নক্ষত্রের কাছে। এবং সমস্ত কথাই তো বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছে!”

“নিজের সঙ্গে নিজের বলা কথা যে বিশুদ্ধ মায়া। আশ্চর্য আত্মরতি। নিজের হাতের ছেনি আর হাতুড়ির আঘাতে নিজেরই পুনর্নির্মাণ।” কবিকণ্ঠে সূক্ষ্ম অভিমান খেলা করল।

পাখির গলা গম্ভীর, “বেশ, তবে ফিরে যাও। প্রেতিনীর রূপকথায় প্রভাতের মতো মেস খুঁজে নাও। প্রভাতের মতো ওখানেই মরে পড়ে থেকো। অথবা, মাল্যবানের মতো কলেজস্ট্রিটের ভাড়া বাড়ির নীচের কামরায় মুখ গুঁজে অসুখী দাম্পত্যের গ্লানি যাপন করো।”

কথার মাঝেই এসে পড়ল সুচরিতা ও লাবণ্য। কবির বিছানায় ঝুঁকে সুচরিতা জিগ্যেস করল, “আগের চেয়ে একটু কি ভালো লাগছে, দাদা? যন্ত্রণা কমেছে?”

দুবার চোখের পাতা পড়ল কবির। তাতে কিছুই বোঝা গেল না। লাবণ্যের দিকে তাকাল কবি। অস্ফুট গলায় একটি গানের লাইন থেমে থেমে বলল, “জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, / বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে।”

সচকিত হল লাবণ্য। মনে পড়ল, তাদের ফুলশয্যার রাত্রির কথা। বেহাগ রাগের ওপর রবীন্দ্রনাথের এই গানটিই শুনতে চেয়েছিল তার স্বামী।

স্বামীর অনুরোধে সেদিন যতখানি চমকে উঠেছিল, বিস্মিত হয়েছিল, আজ এই অসুস্থ মানুষটির মুখে পুনরায় সেই গানের কথা শুনে বুকের গভীরে আশ্চর্য আলোড়ন হল। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারল না। মাথা নিচু করে সে ধীরে পায়ে ওয়ার্ড ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

লাবণ্য ওভাবে বেরিয়ে যাওয়ার খুশি হল পাখি। ভাবল—দাম্পত্য এমন এক আশ্চর্য সম্পর্কের সুতো যে জগতের শক্তিশালী কাঁচি দিয়েও তা কাটা যায় না। আবার, অভিমানের সামান্য উত্তাপে তা গলে যায়, আজীবনের মতো ছিন্ন হয়। সময় বিশেষে এই ছিন্নতা জরুরিও।

সন্ধে গড়িয়ে রাত্রি গভীর হলে পাখি বলল, “তুমি কি অভিমানে ক্রমশ নীল হয়ে উঠছ?”

কবি নিশ্চুপ থাকল। পাখি দেখল, কবির চোখের কোনায় একবিন্দু জল বালির বুকে মিশে থাকা অভ্রকণার মতো চিকচিক করছে। পাখির মন এতে মোটেই বিষণ্ণ হল না। বরং বলল, “কবি, তোমার আকাশ-জন্ম হচ্ছে।”

আকাশ-জন্ম! শব্দবন্ধটা ভারী সুন্দর মনে হল। কবি বলল, “আকাশ-জন্ম!”

“হ্যাঁ। এই যে অভিমান ক্রমশ তোমাকে নীল করে তুলছে, তুমি এই নীল ছুঁয়ে আকাশ হয়ে উঠছ…”

“যদি তা-ই হয়, তাহলে গ্রহ কই? নক্ষত্র কই? আমার বুকের ওপর আগুন নিয়ে উড়ে চলা উল্কার দল কই?”

“সব আছে। ক্রমাগত তারা জানান দেবে। সময় আসুক। কবি, তুমি কি জানো, আশ্বিন পার হয়ে কার্তিক শুরু হয়েছে?”

অদ্ভুত এক প্রশান্তি খেলা করল কবির মুখে। ফুলে থাকা মুখমণ্ডলেও আশ্চর্য এক দীপ্তি ক্ষণিকের জন্য আভা ছড়াল।

কবি বলল, “বাহ্‌, হেমন্ত এসেছে। কার্তিকের মাসে— / তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে—তখন হলুদ নদী / নরম-নরম হয় শর কাশ হোগলায়—মাঠের ভিতরে।”

“আমরা যাইনি মরে আজও—তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়: / মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে, / প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন—এখনও ঘাসের লোভে চরে / পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর ‘পরে।”

পাখির কন্ঠে কবি তার কবিতার লাইনগুলো শুনে খুশি হল। বলল, “বরিশালের ব্রজমোহন স্কুলে পড়তাম। সেই স্কুলে মস্ত বড় মাঠ ছিল, জানো! আর, সেই মাঠের পাশে ছিল মন্তাজ মিঞার আস্তাবল। সেই মাঠে বহুবার রুপোলি জ্যোৎস্নার রাত্রিতে আস্তাবলের ঘোড়াদের মাথা ঝুঁকিয়ে মগ্ন হ’য়ে ঘাস খেতে দেখেছি।”

“মন্তাজ মিঞা কি তোমার লেখায় মহীন হয়ে ফিরে এসেছে? আর, সেই ঘোড়াগুলোই কি নিওলিথ-স্তব্ধতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে থাকত?”

মুখ দেখে মনে হল, কবি হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। জবাব দিল না। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর জিগ্যেস করল, “আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ তো, আকাশে কি ধূসর পাণ্ডুলিপির রং ছড়িয়ে রয়েছে?”

পাখি মুখ বাড়িয়ে বাইরের দিকে তাকাল। বাইরে হাসপাতালের গায়ে যে গাছটি ডালপালা ছড়িয়ে আকাশের অনেকটা আড়াল রেখেছে, তারই ফাঁক দিয়ে যতটুকু দেখা যায়, পাখি দেখল, দক্ষিণ থেকে উত্তরে ভেসে চলা মেঘের টুকরোগুলো যেন কবির পাণ্ডুলিপির এক-একটি পৃষ্ঠা। পুরোনো ধূসর পৃষ্ঠাগুলো থেকে যে রংয়ের আভা ছড়িয়ে যাচ্ছে, তাতে পুরো আকাশটাই ধূসর পাণ্ডুলিপির রংয়ে ঢাকা পড়েছে!

পাখি অবাক হল না। বরং ভিতরে আনন্দ ও উত্তেজনা টের পেল। বুঝল, বিকল ঘড়ির কাঁটা সময়ের গতি কখনও রুদ্ধ করতে পারে না। কবির অবস্থাও ঠিক পথে এগোচ্ছে।

সপ্তাহ ফুরিয়েছে। কত মানুষ এল। কত মানুষ চলে গেল। মানুষের এই চলাচলের মাঝে বিছানায় শায়িত মানুষটিকে কুলুঙ্গিতে রাখা প্রদীপ শিখার মতো এলোমেলো হাওয়ায় কখনও নিষ্প্রভ, কখনও-বা উজ্জ্বল দেখিয়েছে।

গতরাত্রি থেকে গলার আওয়াজে পরিবর্তন এসেছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। বুকে ঘড়ঘড় আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বুক অস্বাভাবিকভাবে ওঠা নামা করছে। বুনো মহিষ যেভাবে ক্রোধে মাথা নাড়ে, সামনে দাঁড়ানো শত্রুকে সুদৃঢ় শিং দিয়ে ছিন্নভিন্ন করার আক্রোশে ফুঁসতে থাকে, অনেকটা সেরকম। যদিও কিছু পরেই বুক আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

অনেক চেষ্টাতেও কবিকে সকাল থেকে কিছুই খাওয়ানো যাচ্ছে না। অর্ধনিমীলিত দুই চোখ। ধ্যানস্থ বুদ্ধের মতো। ডাক্তার এবং নার্সদের মুখে-চোখে বিষণ্ণতার আভাস। ডাক্তার বললেন, “ফুসফুসে রক্ত জমেছে। সেই সঙ্গে নিউমোনিয়া।”

কবির বুক থেকে স্টেথো তুলে নিজের গলায় ঝুলিয়ে ডাক্তার ওয়ার্ড ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই নার্স এসে ইঞ্জেকশন দিল। ইঞ্জেকশন দিয়ে ফিরে গেল ডিউটি টেবিলে।

নার্স চলে যাওয়ার পর পাখি স্পষ্ট শুনল, “পায়ের জোর আর ফিরে পেতে চাই না। পা মানুষের দিকে নিয়ে যায়। পা মানুষের বানানো অলীক সংঘ ও সমাজের দিকে নিয়ে যায়। নিয়ে যায় অহেতুক দ্বন্দ্বের দিকে।”

“তাহলে?”

“দুটো ডানা চাই। দুপুরের রৌদ্র পড়ে যে ডানার পালক স্বর্ণাভ হয়ে উঠবে। যে ডানার রংয়ে মিশে থাকবে হেমন্তের মাঠে পাকা ফসলের সোনালি আঘ্রান।”

“তুমি তো চিরকাল পাখিই হতে চেয়েছ। কখনও শঙ্খচিল, কখনও শালিক, কখনও কাক, কখনও হাঁস। তা, ডানায় ভর করে কোথায় যাবে তুমি?”

“রূপসার ঘোলা জলে, যেখানে সেই কিশোর আজও ছেঁড়া পালে ডিঙা বায়। যাব, বনের হিজল গাছের কাছে। হিজল গাছ যেভাবে খয়েরি ডানার শালিখকে ডাক দিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের পাশে, আমিও সেই হিজলের হৃদয়ের কাছে চেয়ে নেব নিজের আশ্রয়।”

কলকাতায় হেমন্তের বিকেল সন্ধে ছুঁল। রাস্তায় তেমন আলোর জোর নেই। বিশেষ করে এই হাসপাতালের পাশে দিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে, সেখানে আলো-আঁধারির ভিতর মানুষজনের চলাচল ছায়ার মতো। শীত আসতে অনেক দেরি, তবু মৃদু হাওয়ায় রেশমের মতো নরম ঠান্ডার স্পর্শ।

হেমন্তের সন্ধে অজানা এক মনখারাপের চাদরে ঢেকে রাখে সমস্ত শহর। রাত যত গভীর হয়, মানুষ ও যানবাহনের শব্দ যত ক্ষীণ হয়ে আসে, হেমন্তের অতিসূক্ষ্ম ধোঁয়াশায় এ শহর ক্রমশ অলৌকিক হয়ে ওঠে। ফাঁকা গলি পথ, রাস্তার ক্ষীণ হলদে আলোয় ঘরবাড়ি, গাছেদের নিঃশব্দ ছায়া পড়ে থাকে ধুলোয়, নির্জনতায়।

পাখি বাইরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। দেখল, কবির ঠোঁট মৃদু কাঁপছে। অথচ সমস্ত দেহ প্রায় নিথর। দূরে কোথাও গ্রান্ডফাদার ক্লকে এগারোটার ঘণ্টা বাজল। পাখি অপলক চোখে তাকিয়ে রয়েছে কবির দিকে।

ওয়ার্ডের ভিতর হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ নার্সের চোখ পড়ল কবির ওপর। সামনে এসে ঝুঁকে দাঁড়াল। তারপরেই দ্রুত সে ডিউটি টেবিলের দিকে হেঁটে গেল।

পাখি দেখল, কবির ঠোঁটে আর কোনও কম্পন নেই। পাখি জিগ্যেস করল, “তুমি কোথায়?”

পাখি দেখল তারই মতো একটি পাখি ডানা ঝাপটে উড়ল। সঙ্গে সঙ্গে সেই উড়ন্ত পাখিকে বলল, “এসো, এই পথ দিয়ে বেরিয়ে যাই…”

ভাঙা জাফরির ফোকর দিয়ে রাত্রির আকাশে বেরিয়ে এল দুই পাখি। দুই পাখি পাশাপাশি উড়ছে। প্রথম পাখি জিগ্যেস করল, “হিজলবনের দিকে যাব?”

“হ্যাঁ।”

রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটল। সামনে নদী। তীরে অজস্র হিজল। শাখায় শাখায় ঝুলছে রক্তাভ ফুল। সেই শাখায় বসল দুই পাখি। দেখল, মাঝ নদীতে ভেসে যাচ্ছে ডিঙি। সাদা ছেঁড়া পালে ডিঙি বাইছে এক কিশোর।

রোদ্দুর যখন তাদের ডানায় এসে পড়ল, তাদের ডানার পালক ক্রমশ সোনালি হয়ে উঠল।

প্রথম পাখি বলল, “এবার যেতে হবে আমায়।”

“কোথায়?” জানতে চাইল দ্বিতীয় পাখি।

“সুইডেন। মারিকা স্টিয়ার্ন্সটেড অপেক্ষা করে আছে। সুইডিশ লেখক। তোমার মতো আগামীকাল সে-ও আকাশে উড়বে। তাকেও তার নিজের জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে।”

দ্বিতীয় পাখি অবাক চোখে তাকাল প্রথম পাখির দিকে। একদিন যে সোনালি ডানার চিলকে সে কেবল ধানসিড়ি নদীর পাশে কাঁদতে দেখেছিল, সে আজ কাঁদছে না। বরং দূরের আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুধু একবার জিগ্যেস করল, “তুমি কি এভাবে সবার কাছেই যাও?”

“না। ধূলিধূসর পৃথিবী যাদের চিন্তার উৎকর্ষ চেনে না, যাদের মূল্যহীন করে রাখে, সময় কেবল তাদের কাছেই আমাকে পাঠায়। অনন্তের মহলে তাদের পৌঁছে দিতে বলে। আমি সেই কাজই করি। কালের দায় বহন করি।”

উড়ে গেল পাখি। হিজলের শাখায় বসে দ্বিতীয় পাখি দেখল, দীর্ঘ সোনালি ডানায় বাতাস ভেঙে দূর শূন্যের বুকে ক্রমশ বিলীন হয়ে গেল এক সোনালি ডানার চিল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *